অদ্ভুত আঁধার (প্রথম পর্ব)

  • 1
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

বেঙ্গল গ্যালারিতে এসে বেশ অবাকই হলাম। এখানে এসেছি বিপাশার একক চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে। প্রদর্শনীর নাম ‘আসছে ফাগুনে দ্বিগুণ হব’ নামে-চিত্রকর্মে মুগ্ধ হলেও দূর থেকে বিপাশাকে দেখে চিনতে আমার বেশ কষ্টই হলো। ওকে শেষবার দেখেছিলাম বছর দশেক আগে। অনেক বদলে গেছে বিপাশা, বুড়িয়েও গেছে খানিকটা। ও যখন ছোট ছিল, তখন আমি যে খুব-একটা বড় ছিলাম; তাও না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চার ক্লাস নিচে পড়ত বিপাশা। আমি বাংলায়, ও চারুকলায়। ওর প্রেমিক বশির আমার সহপাঠী ছিল। সেই সূত্রে বশিরের ওপর ছিল আমার অনিবার্য ঈর্ষা। বন্ধুর সাফল্যে ওপরে-ওপরে উল্লসিত হলেও ভেতরে-ভেতরে মানুষ জ্বলে-জ্বলে অঙ্গার হয়, পুড়ে-পুড়ে খাক হয়। নিজে অভুক্ত থাকার মাঝে যত যন্ত্রণা, এর চেয়ে বেশি যন্ত্রণা বোধ হয় অন্যকে খেতে দেখলে।

বিপাশা প্রায়ই যখন বশিরের বাহারি স্কেচ এঁকে দিত, বশির ধেই-ধেই করে নেচে-নেচে সবাইকে দেখাত। আর আমি পুড়তাম হিংসার অনিবার্য অনলে। একদিন সাহস করে বিপাশাকে বলেই ফেলেছিলাম,
– ‘শুধু প্রেমিকের ছবি আঁকলে চলবে, বিপা? প্রেমিকের বন্ধুদের পানেও একটু সুনজর দাও। আমাদের ছবিও একটু নাহয় আঁকো!’
আধো-অহম আধো-রহস্যে আবৃত বিপাশা বলেছিল,
– ‘প্রেমিক ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের ছবি আমি আঁকি না। তা ছাড়া আপনার চোখ দুটো খাটাশের মতো। মানুষের দেহে খাটাশের চোখ আমি আঁকতে পারব না। যদি চান, আপনার চোখ-ছাড়া ছবি এঁকে দিতে পারি। এই বয়সেই অন্ধ হতে চান, নাজিম ভাই?’

আমি জানি না আমার চোখ খাটাশের মতো কি না। বিপা বশিরকেও প্রতিনিয়ত নানাবিধ হিংস্র ইতর প্রাণীর সাথে তুলনা করে গালাগাল করত, তাই ওর খাটাশ-তত্ত্বে কিছু মনে করিনি। তবে মুখের ওপর ‘না’ কথাটা শুনে সে-বার বেশ আহত হয়েছিলাম। অবশ্য নারীর মুখে ‘না’ শব্দটি খুব মানানসই। ‘না’ পৃথিবীর দৃঢ়তম ধ্বনি, প্রগাঢ়তম প্রতিবাদ। যে নারী এই এক-অক্ষরের ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করতে শিখেছে, তাকে কখনও আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বিপাশার ঐ না-টাই বিপাশার জন্য আমার তেষ্টা মুহুর্মুহু বাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন যখন আমিও কিছুটা নাম কামিয়েছি। সদ্য-অঙ্কুরোদগম-ঘটা উদ্বাহু ঊর্বশীরা যখন আমাকে জাপটে ধরে বইমেলায় স্বালোকচিত্র তোলে। আবদার করে কবিতা লিখে দেয়ার জন্যে; তখন আমিও বুঝি— প্রেমিকা ছাড়া অন্য কোনো নারীকে নিয়ে কবিতা লেখা একজন পুরুষের জন্য যতটা দুঃসাধ্য, একজন নারীর জন্য ঠিক ততটাই দুঃসাধ্য প্রেমিক ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের ছবি আঁকা। ইচ্ছের বিরুদ্ধে কলম বা তুলি চালানোর সাথে বলাৎকারের সবিশেষ পার্থক্য নেই।

[চলবে]

১৭/০৩/২০২০, ১০.৫১ PM

অদ্ভুত আঁধার (দ্বিতীয় পর্ব)

অদ্ভুত আঁধার (তৃতীয় পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *