অন্তর্বাসের অন্তঃকোন্দোল

  •  
  •  
  •  
  •  

নারীতে সুখ, নারীতে মুখ- তবুও সার্কাজম আমাদের অভ্যাস। এটি দূর হবে। বিশাল লেখা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য! পড়লে সুরসুরিও লাগতে পারে।

এক. আমার বান্ধবীরাও এই ব্রা পেন্টির নাম বলতে লজ্জা পায়। অথচ আজকাল কিন্তু পথে ঘাটে অনেক নারীর শরীরের ভিতর থেকেও ব্রার কাঠামো বা নকশা স্পষ্ট দেখা যায়। তাহলে বলতে লজ্জা কেন!

দুই. ঢাকার কাপড়ের দোকানগুলোতে এই ব্রা পেন্টি সামনেই থাকে। বিশেষত নিউমার্কেট, বাইতুল মোকাররম সহ সব মার্কেটগুলোতেই। এতোই যদি আপনাদের চেতনার শক্তিতে হিট লাগে তাহলে বলছি আপনাদের জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের একদম ওয়াল ঘেষেই এটি জনসম্মুখে বের করা থাকে। আর তা শুকানোর মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে না – বিক্রি করতে।

তিন. আমার তো মনে হয়, অধিকাংশই হোক তা তরতাজা কি বুড়ো এই জিনিসদুটো আড়ালে পেলে ঠিকই ধরে, ছুঁয়ে আর শুঁকে দেখবেন। যেখানে মজা লাগে সেখানে যেন রোগ না হয় তাতেও তো সম্মান দেখানো উচিত।

চার. ইদানীং ছেলেদের এমন কিছু প্যান্ট বের হইছে যে, পড়লে বা বসলে তাতে তাদের পাছার সংযোগস্থল শো হয়ে থাকে। আবার কখনো নাভির নিচও বের হয়ে থাকে। ভাই, শালীনতার কথাও যদি বলেন তা কিন্তু সবার জন্যেই প্রযোজ্য। আপনার জাঙ্গিয়া ঘরের নারী ধুয়ে দিয়ে শুকাতে দিতে পারলে আপনারও একই কাজ করা উচিত তাদের প্রয়োজনে।

পাঁচ. করোনা হলেও যে দেশে বলতে ভয় সেদেশে নারীর রোগ বা সমস্যা নিয়ে তারা যে চিপাতেই আছে তা বুঝতে গবেষণা লাগে না।

নারী তে সুখ, নারীতে মুখ- তবুও সার্কাজম আমাদের অভ্যাস। এটি দূর হবে এমন কিছু বোনের সাহসি পদক্ষেপের মাধ্যমে। নারীর নিরাপত্তা ও সু্স্থতা ছেলেদের চেয়েও বেশী দরকার। কারন প্রজন্ম গড়ে উঠে তাদের কোলে।

এবার লেখাটি পড়তে শুরু করুন।

“বিষয়টা নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিলো। যেহেতু ফেসবুকে বিষয়টা এসেছে, লেখার এখন ভালো সময়। আমার দুইটা বোন। আমার বড়। ছোটোবেলা থেকেই দেখেছি ওরা ওদের অন্তর্বাস গোসলের পর বা ধোয়ার পর জামা না ওড়নার নিচে রেখে শুকাতে দেয়। আগে ন্যাপকিন ব্যবহারের সুযোগ ছিলো না ওদের। তাই পুরাতন কাপড় কেটে, ধুয়ে ওরা পিরিয়ডের সময় ন্যাপকিন হিসেবে ব্যবহার করতো। সেগুলোও গোপনে শুকাতে দিতো। ওদের এবং আশপাশের সবার এমন কাজে আমাদের মাথায় সেট হয়ে গিয়েছিলো যে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গোপন। সামনে আনা যাবে না।

গোপন এটা ঠিক। কিন্তু সব বিষয় যে সামনে আনা যাবে না, তা কেন! গোপন কোনো অসুখের জন্য অপরিচিত ডাক্তারের সামনে যদি সব প্রকাশ করা যায়, প্রসবের সময় অচেনাদের সামনে যদি নিজেকে সঁপে দেওয়া যায়, তবে সামান্য অন্তর্বাস আর পিরিয়ডের কাপড় বাড়ির বা আশপাশের কজন দেখলে কী এমন ক্ষতি হয়ে যায়? ক্ষতিটা আর কোথাও হোক না হোক, মেয়েদের নিজেদেরই কারো কারো ক্ষতি হয়ে যায়। হ্যাঁ এটা ঠিক যে সমাজে ফেটিসিজমের আওয়াতাধীন কিছু বিকৃত লোক আছে, যাদের অন্তর্বাস দেখে যৌন চাহিদা সাড়া দেয়। অনেকে যৌন চাহিদা মেটায়ও এসবে। সেইসব দুইএকজন লোকের জন্য কেউ নিজের ক্ষতি ডেকে আনবে না স্বাভাবিক।

অন্তর্বাস সাধারণত পোশাকের নিচেই পরা হয়। যে কারণে দীর্ঘক্ষণ ঘামের সাহচর্যে থেকে অন্তর্বাসে ব্যাকটেরিয়ার বসতি হতে পারে। হয়ও। এজন্য এগুলো ভালোমতো ধুয়ে কড়া রোদে শুকানো অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এই কাজটা কজন করছে? সবাই স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে কাপড়ের নিচে, দরজার পেছনে বা ঘরের আলোহীন ঘুপচিতে শুকাতে দিচ্ছে এসব। আমরা পুরুষেরা আমাদের কথা ভাবছি। নীতিকথা ভাবছি। আমাদের ভাবনার আড়ালে কত মা-বোন এসব সমস্যার কারণে জরায়ু/যৌনাঙ্গের সমস্যায় ভুগছে, তার খবর কিন্তু আমরা রাখছি না। ক্যান্সার পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে অনেকের। স্তন, জরায়ুর সঠিক পরিচর্চার অভাবে, অপরিচ্ছন্নতার অভাবে কতজন কত সমস্যায় ভুগছে তার অনেকটা এখন কিন্তু প্রকাশিত।

ছবি: তানহা খান। একজন মেয়ে।

যাদের ঘরে এমন সমস্যা আছে, আর যারা অন্যের সমস্যাকে নিজের করে ভাবতে জানে, তারা এর ভয়াবহতা বুঝতে পারবে। আমার বড়বোনের সাথে আমি এসব ব্যাপারে খোলামেলা কথাবার্তা কম বলি। আমার ইমিডিয়েট বড়টার সাথে সব শেয়ার করি। ওকে দিয়ে বলিয়েছি যে বড়বোন যেন অন্তর্বাস আর পিরিয়ডের ন্যাকড়া ভালোভাবে পরিষ্কার করে, প্রয়োজনে গরম পানিতে ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ভালোমতো যেন শুকায়। নাহলে একবার সমস্যা হলে ডাক্তার দেখানোর এত এত টাকা কিন্তু নাই আমাদের। পিরিয়ডের ন্যাকড়া লুকিয়ে শুকাতে দিতো বেড়ায় গুজে। এত ভয় লাগতো আমার। পোকামাকড় হয়তো উঠেছে সেই কাপড়ে, হয়তো জীবাণুওয়ালা ধুলোবালি লেগে গেছে। সেই কাপড় আবার ব্যবহার করা হবে! এখন বড় হয়েছি। বলি।

বড়বোন এখন স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে। জামা-ওড়নার নিচে ব্রা শুকাতে দিলে আমি নিজেই মাঝে মাঝে সরিয়ে স্বাভাবিকভাবে শুকাতে দেই। বিশ্বাস করুন বিষয়টা সামান্য নোংরা লাগে না আমার কাছে। বরং মনে হয় সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচাচ্ছি। এক পোস্টে এক ভাই লিখেছে, ইসলাম ধর্ম এগুলোকে গোপন রাখতে বলেছে। বলেছে পোশাক দেখে যেন শরীরের পরিমাপ না করা যায়। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো তাহলে কোথায় শুকাতে দেবে? সে জানালো, ঘরের মধ্যে ফ্যানের বাতাসে। ব্যালকনিতে। আচ্ছা এইদেশে ফ্যান কদিন ধরে এসেছে মানুষের ঘরে ঘরে? বেলকনি কজনের আছে? গ্রামে এখনও কি সবার ঘরে ফ্যান আছে? ব্যালকনি আছে?

তাহলে সামান্য অন্তর্বাস শুকানো নিয়ে এত সমস্য কেন হবে ঘরে ঘরে মা বোনদের? তারা যখন এগুলো কিনতে যায়, অচেনা দোকানদারের থেকেই তো কেনে। তাতে সমস্যা নাই। আর শারীরিক সুস্থতার জন্য রোদে বা আলোতে শুকাতে দিলে এত সমস্যা মানুষের? জানি এই লেখা পড়ে অনেকে একমত যেমন হবে, তেমনি বাজেভাবে মতামত দেবে। নিজের সর্বোচ্চ বুদ্ধি খরচ করে অপমান করে মতামত দেওয়ার চেষ্টা করবে কেউ কেউ। তাতে কী হবে? আমার কিছুই হবে না। কিছু লোকে জাস্ট হাসবে সেইসব মতামত পড়ে, মজা পাবে।

কিন্তু বাস্তবতাটা একটু নিজের পরিবারের সাথে ভেবে দেখুন। স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে অন্তর্বাস শুকিয়ে ব্যাকটেরিয়া নিয়ে যে অন্তর্বাস আপনার মা বা বোন পরবে, তা পড়ে যদি তারা রোগ বাঁধায়, পারবে আপনার বাবা বা আপনার দুলাভাই তাদের চিকিৎসা দিতে? নাকি অচেনা ডাক্তারের কাছেই গোপনাঙ্গ মেলে ধরতে হবে? আছে চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত টাকা? জীবনকে সহজ করুন। গোঁড়া যুক্তি দিয়ে কঠিন করার দরকার নাই। পৃথিবী হাজার বছর এগিয়ে গেছে। অনেক কিছুই বদলে গেছে। আরো বদলাবে। এখন শুধু দরকার আমাদের মানসিকতা বদলানো।

০৪/০৬/২০২০, ০৯.১০ PM

লেখক: নাসির খান। একজন ছেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *