অভয়ের বিয়ে (শেষ পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “হঠাৎ দেখা” কবিতাটা পড়ার সময় পুনা একেবারে চুপচাপ আমার বুকে কান পেতে শুনলো। আর একটু পরে পরে আমায় আঁকড়ে ধরলো। আরো অনেক কবিতা ওকে শুনিয়েছি। ওর অনুরোধে আমার লিখা “ইচ্ছে” কবিতাটাও শোনালাম।
“আমার খুব ইচ্ছে করে কারো প্রতীক্ষার প্রহর হতে
কাকচক্ষু জলের মতো কারো চোখে
তীব্র অনুভূতির টলটলা অশ্রুর কারণ হতে
ভালবেসে যে আমায় প্রার্থনা করবে ঈশ্বরের দুয়ারে
ইচ্ছে করে কারো চুলের সিঁথির ভাঁজে
সিঁদুর পরা আশীর্বাদের দাবিদার হতে।”
কবিতাটা আবৃত্তি করার সময় পুনা পাঞ্জাবি খামচি দিয়ে ধরেছিলো আমার বুকের কাছে ।
– “তোমাকে বোঝাতে পারবো না এই কবিতাটা আমার কত প্রিয়। বিশ্বাস করবে, প্রথম যেদিন কবিতাটা পড়ি সেদিন তোমায় আশীর্বাদে সিঁথিতে রেখেছিলাম। আমার কাছে তো সিঁদুর ছিল না। লাল রঙের লিপস্টিক দিয়ে সিঁদুর এঁকেছিলাম।”
বউ আমার থামলো। আমি অধীর আগ্রহে জানতে চাইলাম,
– “কি বলো পুনা। আমাকে বলোনি কেন এতোদিন?”
– “লজ্জা লাগে না বুঝি আমার। তখন তো তোমার সাথে আমার কোন কিছুই ছিল না। এক সামান্য পাঠিকা ছিলাম তোমার গল্প-কবিতার। যখন বিয়ের সব ঠিক হলো তখনই ঠিক করে রেখেছিলাম বাসর রাতেই কবিতাটা শুনবো তোমার কাছ থেকে।”
– “তখন থেকেই ভালবাসতে আমায়?”
– “উঁহু তারও আগে থেকে।”
– “কখন থেকে?”
– “ইসসস। সব কেনো শুনতে হবে তোমায়। বলবো না পচা।”
কি করে যেন খুব দ্রুত ফুরিয়ে গেল রাতটা। কথায় কথায় এতো সুন্দর সময়ের মাঝে টুক করে ঘুমিয়ে পরলো পুনা।

অনেক ক্লান্ত ছিলো ও। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় বউয়ের ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। কপালে পরেছিলো চূর্ণ চুল। কানের পাশে গুঁজে দিলাম। বউ এক হাত দিয়ে আমার পাঞ্জাবির বুকের কাছে মুঠো করে ধরে আছে। এই মুঠো ছাড়াবার সাধ্য আমার নেই। কোন স্বামীরই বোধহয় থাকে না। থাকতে নেই। মোমবাতি গলে গলে বিলিন হয়ে নিভে গেছে। যেন মাথার কাছে সারা রাত পাঁচটা চাঁদ জ্বলে জ্বলে আমাদের লালচে জোছনা বিলিয়েছে। সেই গলে যাওয়া জোছনা মোমদানিতে কি এক ঐশ্বর্য নিয়ে পরে আছে। এই গলে যাওয়া জোছনার মতো মোমদানি রেখে দিয়েছি এক পাশ করে। ঘুম থেকে উঠে অন্য কোথাও তুলে রাখবো। মোমদানিটা সারাজীবন থেকে যাক আজকের রাতের স্মৃতি হয়ে।

কত ভরসা নিয়ে কত নির্ভরতায় বউ আমার বুকের কাছে ঘুমুচ্ছে। ওকে আরো কাছে টেনে নিলাম। ওর চুলের গন্ধে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছি। আমি ভোর পছন্দ করি না। সূর্যের আলো আমার সহ্য হয় না। কিন্তু কি আশ্চর্য।জীবনে এই প্রথম ভোরটাকে এতো পবিত্র; এতো অপরূপ লাগলো। পাখীর ডাক। জানালা গলে আসা ফুরফুরে বাতাস। সবই যেন খুবই প্রাণবন্ত। যার বুকের কাছে এমন একটা স্বর্গ ঘুমায় তার কাছে দুনিয়াটাই একটা স্বর্গ হয়ে যায়। পুনা ওর অজান্তেই আমায় একটা স্বর্গ এনে দিলো। ওর কপালে আলতো চুমু দিয়ে চুলের গন্ধে আমিও যে কখন ঘুমিয়ে পরলাম জানি না।

২০/০৯/২০২০, ১১.২৬ PM

অভয়ের বিয়ে (প্রথম পর্ব)

অভয়ের বিয়ে (দ্বিতীয় পর্ব)

অভয়ের বিয়ে (তৃতীয় পর্ব)

অভয়ের বিয়ে (চতুর্থ পর্ব)

অভয়ের বিয়ে (পঞ্চম পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *