অ্যা লং হিষ্টোরি অফ অ্যা শর্ট জার্নি (ষষ্ঠ পর্ব)

  • 1
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

ষোল
রাত বারার সাথে সাথে আমার শরীর গরম হতে থাকলো। সেই সাথে পেট পাক দেয়া শুরু করলো। এবং প্রচন্ড ঘাম শরীর বেয়ে গোসল করার মতো হয়ে গেল। মাথার উপরের ফ্যান প্রান পন ঘুরেও গরম আর অস্থিরতায় ভরা এই আমাকে ঠান্ডা করতে সম্পূর্ন ব্যর্থ হলো। যতই রাত বাড়ছে, ততই আমি ক্লান্ত হয়ে পরছি। শরিরের শক্তি লোপ পাবার মতো হয়ে গেল। শুধু মাত্র থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট ছাড়া শরিরে কিছুই নেই। তার পরেও গরমে সিদ্ধ হবার জোগার। এ যেন কেউ আমাকে বড় পাতিলে ফুটন্ত পানিতে ছেঁড়ে, নিচে দিয়ে ইট ভাটার চুল্লি জ্বালিয়ে দিয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত বাজে ১২ টা। মুরগির বিরিয়ানি খাওয়ার পরে আমি হাফ প্যাকেট সল্টেড চিপস এবং হাফ বোতল আমের জুস খেয়েছিলাম। সেটা যেন মারাত্নক হয়ে ধরা দিলো। আমি তখন একটুও বুঝতে পারিনি, বাসি গন্ধ যুক্ত বিরানির সাথে সল্টেড চিপস মিলে পেটে পাক ধরাবে এবং বাজে বিক্রিয়া ঘটিয়ে আমাকে প্রচন্ড রকম অসুস্থ করে তুলবে। আমি ফ্যানের দিকে হা করে তাকিয়ে আছি, আর লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আমার মাথা ধিরে ধিরে কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। হাত পা অবস হয়ে আসছে। শরীর থেকে অত্যাধিক ঘাম বের হবার দরুন আমি পানি শুন্যতায় ভুগতে শুরু করছি। ডি-হাইড্রেশন এর লক্ষন। আমার মনের মানষপটে ভেসে উঠলো আমার পরিবারের সকল সদস্যদের মুখ। সেই সাথে আরো একটি মুখ ভেসে উঠলো যাকে আমি ইন্ডিয়া আসার পূর্বে রাগ করে ফেসবুক থেকে ডিলিট করে দিলেও ম্যাসেজ করে এসেছিলাম। তাকে সরি বলা হয়নি। তাকে সরি বলার জন্য হলেও আমাকে বেঁচে থাকতে হবে, দেশে ফিরতে হবে।

ছবিঃ হোটেলের ভিতরে নিজ কামরায়
স্থানঃ কলকাতা, ইন্ডিয়া

সতের
গত দুই দিন ধরে প্রচন্ড জ্বর, আর মাথা ব্যাথা। ঠিক মতে খেতে না পারার দরুন আমি বেশ দূর্বল। নিজের কামরায় পড়ে আছি আজ দুই দিন ধরে। পাশের রুমের মানুষগুলো জানেই না আমি রুমে আছি নাকি নেই। আমি বেঁচে আছি নাকি মারা গেছি। এখানে বিদেশে কেউ গায়ে পড়ে কারো রুমে নক করে কিংবা উঁকি দিয়ে খোঁজ খবর নেয় না। এখানে মানুষ জীবন কাটায় একা। অন্তত আমি গত ২/৩ বছর ধরে তাই দেখছি অষ্ট্রেলিয়াতে। কাজের যায়গা থেকে ছুটি নিয়েছি। সিক কল দেয়ায় কাজে না যেয়েও বেতন আমার একাউন্টে চলে আসবে। সুতরাং টাকা নিয়ে চিন্তিত না। আমি চিন্তিত, বেঁচে থাকা নিয়ে। ডাক্তার দেখাতে যাব একা একা সেটাও সম্ভব না। অন্ধকার ঘর। কখন জাগছি আর কখন ঘুমাচ্ছি কিছুরই ঠিক নেই। বাসায় ফোন করে এই অবস্থায় কথা বলে লাভ নাই। মা অনেক কষ্ট পাবে। তার আদরের সন্তান, সাত সমুদ্র আর তের নদীর পারের কোন এক দেশে প্রচন্ড অসুখ নিয়ে বিছানায় পড়ে আছে আর সে কিছুই করতে পারছে না। এটা একটা মায়ের কলিজা চূর্ন বিচূর্ন করতে যথেষ্ঠ। জ্বরের দ্বিতীয় দিনের নাকি রাতের বেলা সিলিঙের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম, এভাবে পড়ে থাকলে আমি আর সুস্থ হবো না। আমাকে সুস্থ হতে হবে। আমাকে উঠে দাঁড়াতে হবে। আমাকে খেতে হবে। আমাকে বাঁচতে হবে। আমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হবে। কোথা থেকে যে মনে এত বল এলো জানি না। খুব ঠান্ডা মাথায় ভাবলাম, বাসায় কিছু নাপাজাতীয় ওষুধ এনে রেখেছিলাম, ইমারজেন্সি সময়ের জন্য। আর খাবার বলতে কৌটায় বিস্কিট আর কিছু শুকনো খাবার আছে। পাশেই একটা বড় বোতলে পানি ভরে রেখেছিলাম হাতের কাছে। দ্রুত উঠে বিস্কিট খেয়ে একটা প্যানাডল (নাপা জাতীয় ঔষধ) খেলাম। তিন বেলা নিয়ম করে শুকনো খাবার, পানি আর প্যানাডল খেয়ে শরীরে যেন ধিরে ধিরে শক্তি ফিরে পেতে শুরু করলাম। তৃতীয় দিন বিকেলে বেলা হামাগুরি দিয়ে দরজার কাছে যেয়ে আমি পাশের রুমমেট কে ডাকতে শুরু করলাম। তার পায়ের শব্দ কাছে আসতে শুরু করলো। দরজা খুলে আমাকে দেখে সে ভূত দেখার মত চমকে উঠলো। জানতে চাইলো, আমার শরীর এতো খারাপ অথচ তাদের কেন জানাইনি। আমি তাকে কিছু খাবার দেয়া যাবে কিনা জানতে চাইলাম। আমাদের সাথে এক মাসি থাকতেন (তিনি বৌদ্ধ ধর্মের ছিলেন)। সেই রুমমেট তার মাসিকে বলে আমার জন্য ভাত তরকারির ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি সে যাত্রায় মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ কৃপায় সুস্থ হয়ে উঠলাম।

Photo: Bilpin Apple Garden
Place: Sydney, Australia.

আঠারো
রাত প্রায় একটা বাজার সাথে সাথে আমার মাথা ঘুরিয়ে প্রচন্ড বমি শুরু হলো। সেই সাথে পাতলা পায়খানা। আরো আছে শ্বাস কষ্ট, জ্বর, মাথা ব্যথা ও প্রচন্ড শারিরিক দুর্বলতা। আমি এক দৌড়ে বাথরুমে চলে গেলাম। কমোডে বসে টয়লেট করার সাথে সাথেই মাথা এক পাশে সরিয়ে সমানে বমি করে চলেছি। একটানা চলছেই। কোন থামা থামি নেই। আমি কোন ক্রমেই একমিনিটের জন্য উঠে দাঁড়াতে পারছি না। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। আমি হিতাহিত জ্ঞান হারাচ্ছি। এ যেন আমার শেষ রাত। আমি আর ভোর দেখব না বলেই মনে হতে লাগলো। এদিকে বমির এক পর্যায়ে গলা দিয়ে রক্তের দলা বের হতে লাগলো। একটানা বমি গলায় বেশ বাজে প্রভাব ফেল্লো। ভোকাল কর্ড আর প্রেশার নিতে না পারার কারনে, রক্ত আসতে শুরু করেছে। পেটে যা কিছু ছিলো সব বের হয়ে গেছে উপর – নিচ দুই দিক দিয়েই। আমি শুধুই আল্লাহকে ডাকছি এক মনে। কমোড থেকে কিছু ধরে যে উঠে দাঁড়াবো তার ও উপায় নেই। বাথরুমের অবস্থা নরক। সে দিকে আমার কোন খেয়াল নেই। চোখ মুখ বন্ধ করে মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করলাম। আমার শরীর জানান দিচ্ছে, পেট যে পরিমান গরম হয়েছে, শরীর থেকে যে পরিমান লবন বের হয়েছে তাতে আমার বাঁচতে হলে উপায় একটাই – শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে। আর রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে হবে। আমার থিওরি হলো – যদি শরিরের তাপমাত্রা ঠিক থাকে এবং ব্লাড প্রেশার কন্ট্রোলে রাখতে পারি তাহলে এ যাত্রায় বেঁচে যেতে পারবো। আমার মনে হয়, মানুষের মৃত্যু ঝুকি তখনই বেড়ে যায় যখন তার শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, আর নয়তো ব্লাড প্রেসার অতিমাত্রায় হাই অথবা লো হয়ে যায়। আমার নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে – এই দুটো জিনিস আগে ঠিক করতে হবে। আমি মনে মনে স্থির করে ফেললাম – আমাকে আমার পরিবারের কাছে বেঁচে ফিরতেই হবে।

ছবিঃ নিউমার্কেট
স্থানঃ কলকাতা, ইন্ডিয়া

[চলবে]

১০/০৬/২০২০, ১১.২৬ PM

অ্যা লং হিষ্টোরি অফ অ্যা শর্ট জার্নি (প্রথম পর্ব)

অ্যা লং হিষ্টোরি অফ অ্যা শর্ট জার্নি (দ্বিতীয় পর্ব)

অ্যা লং হিষ্টোরি অফ অ্যা শর্ট জার্নি (তৃতীয় পর্ব)

অ্যা লং হিষ্টোরি অফ অ্যা শর্ট জার্নি (চতুর্থ পর্ব)

অ্যা লং হিষ্টোরি অফ অ্যা শর্ট জার্নি (পঞ্চম পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *