আমার বাবা

  • 1
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

আমার বাবা চলে গেলেন আল্লাহ তায়ালার কাছে গত ১ লা জুন ভোরবেলা। তিনি ঘুমের মাঝেই আমাদের ছেঁড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমি উনার সামনে ছিলাম না। কখনো মনেই হয়নি এবং বুঝতেও পারিনি বাবা আমাদের ছেঁড়ে এতো তাড়াতাড়ি চলে যাবে। আমি সেদিন সারা রাত কোন এক অজানা কারনে ঘুমাতে পারিনি। ছট ফট করেছি। ভোর ৬ টার দিকে উঠে নিজের ঘরেই হাঁটা হাঁটি করছি। আনুমানিক সকাল ৭টার দিকে আম্মু এবং মেজো ভাই আমার রুমে কান্না করতে করতে যখন ঢুকলেন, তখন আমার বুকের বা পাশটা ছ্যাঁত করে উঠলো। আম্মু আমাকে আব্বুর কাছে যেতে বললেন। আমি দৌড়ে আব্বুর পায়ের কাছে গিয়ে বসলাম। তার সারা শরীর চাদরে ঢাকা। শুধু মুখটুকু বেরিয়ে আছে। দেখলাম, আব্বু ঘুমাচ্ছেন। যেন একটু পর উঠে সকালের নাস্তা খেয়ে কোরআন শরীফ পড়তে বসবেন। আমি তার পায়ে, হাতে, কপালে, মুখে হাত রাখলাম, দেখার চেষ্টা করলাম – নিঃশ্বাস নিচ্ছেন কিনা? কিন্তু হায়, কোথাও তো কোন সাড়া শব্দনাই। মূহুর্তেই আমার পৃথিবী দুলে উঠলো। আমার দু’চোখ বেয়ে নামতে থাকলো জলের স্রোত। আমি বাবা হারা হলাম। বাবাকে ভালোবেসে, জড়িয়ে ধরে “বাবা” ডাকা হলোনা।

আজ দেখতে দেখতে ৫ দিন পার হয়ে গেল। আশ্চর্য! একটা সময় যাদের বাবা নেই তাদের দিকে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম কিভাবে তারা কথা বলে, খায়, নিশ্বাস নেয়, স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে যায়? আজ আমিও তাদের দলে। গতকাল ০৫/০৬/২০২০ ইং তারিখ শুক্রবার বাদ আসর আমার বাবার স্মরনে একটি ছোট্ট ঘরোয়া মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছিলাম। যারা এই ব্যস্ত নাগরিক জীবন থেকে একটুখানি সময় বের করে দোয়া মাহফিলে উপস্তিত হয়ে উনার জন্য দোয়া করেছেন তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। যারা আসতে পারেননি কিন্তু একাধিকবার ফোন করে, মেসেজ এর মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন তাদেরকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

আমার পরিচিত সবাইকে বলছি,
– তোমরা হয়তো বা অনেকেই আমার বাবাকে পারসোনালি চিনতেনা। আমার বাবা একজন ফেরেশতার মতো মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন সৎ, স্বল্পভাষী, মিতব্যয়ী এবং ধর্মভীরু একজন। মানুষের জীবনে অনেক আইডল থাকে। অনেকেই অনেকের মতো হতে চায়। কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক, কিন্তু আমরা ভাই-বোন সবসময়ই আমার বাবা’র মতো হতে চেয়েছি। যদিও তা কখনোই সম্ভব না। উনি অসম্ভব ধর্য্যশিল একজন মানুষ ছিলেন। মানুষের প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার। আমরা আমাদের বাসায় কখনো আব্বুকে জোরে কথা বলতে শুনিনি। কখনো বলতে শুনিনি খাবারে লবন কম কেন? কখনো কারো সম্পর্কে সমালোচনা করতে শুনিনি। তিনি এসব পছন্দ করতেন না। তার সাথে কেউ খারাপ আচরন করলে, কটু কথা বললে, এমন কি তার বাবা-মা, ভাই-বোন তাকে তার প্রাপ্য হক হেকে বঞ্চিত করার পরেও তিনি তাদের সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য কিংবা একটা বাজে কথা কখনোই বলেন নাই। তিনি আমাদেরকে নিজের কর্মের দ্বারা, নিজের শিক্ষার দ্বারা, নিজ বলে বলিয়ান ও পরিচয়ে পরিচিত হতে শিখিয়েছেন।

ছোট বেলায় একটা হাদিস শুনেছিলাম, “তুমি এমন ভাবে দান করো যেন তোমার বা হাতও জানতে না পারে।” তখন কথাটার মর্মার্থ বুঝতে পারিনি। বড় হয়ে আব্বুকে দেখে কথাটা বুঝতে পেরেছি। এখনও কানে বাজে আব্বুর বলা কথা, “অপচয়কারী শয়তান এর ভাই।” খাবার নষ্ট না করার কথা, খাবার না ফেলার দিক্ষা আমি আমার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছি। গ্রামের বাড়ির প্রতি তার অদম্য আগ্রহ ছিল। বাবার শেষ ইচ্ছে ছিলো, তার গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে, তার মায়ের পাশে যেন তাকে দাফন করা হয়। কিন্তু সেখানে উনাকে দাফন করার ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও যাতায়াত ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে। আর তাছাড়া আমি সহ পরিবারের সকল মুরুব্বিরা চাইছিলেন, বাবা যেন সাভারে আমাদের কাছাকাছি থাকেন। চাইলে আমরা যে কোন সময় বাবার কবর জিয়ারত করতে পারবো।

আব্বুকে নিয়ে বলতে গেলে আমি রাতের পর রাত পার করতে পারবো। কিন্তু আজ আর না। খুব ক্লান্ত লাগছে। বাবাহীন নিজেকে খুব অসহায় আর নিঃস্ব মনে হয়। আব্বু সাথে করে আমাদের পরিবারের সবার স্বস্তিটুকু নিয়ে গেছেন। অথচ, জুন মাসের ০১ তারিখ, দিনটা সম্পূর্ন অন্য রকম একটা আনন্দের দিন হতে পারতো। সেদিন আমার মায়ের জন্মদিন ছিলো। আমার মায়ের জন্মদিন কিভাবে কিভাবে যেন বাবার মৃত্যু দিবসে পরিনত হলো। মায়ের জন্মদিন আর ঘটা করে পালন করা হবে না। বাবার মৃত্যুর কথাই ঘুরে ফিরে মনে পড়বে। তোমরা সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করো। আল্লাহ তায়ালা যেন উনাকে বেহেশত নসিব করেন। আর আমরা যেন এমন ভাবে চলতে পারি যেন উনার আত্মা কষ্ট না পায়। “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সগিরা।”

০৬/০৬/২০২০, ১১.৩৮ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *