আমি মৃত মানুষের সাথে কথা বলি

  •  
  •  
  •  
  •  

– ‘আমি মাঝে মাঝে কিছু মৃত মানুষের নাম্বারে ফোন দেই, মোবাইলে কথা বলি’।
একটি লোক কথাটা কানের কাছে বলেই মুখটা ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে। চকিতে ফিরে তাকালাম পেছনে। না, লোকটার মুখ দেখা যায়নি। নীল শার্ট, কাধে ঝুলা এবং মাথায় নীল রঙের টুপি পরা লোকটি ততক্ষণে উঠে গেছে গাজীপুরের বাসে। বাসের হেলপার চিল্লাচ্ছে উত্তরা, টংগি, গাজীপুর। বাসের জানালা দিয়ে উকি দিলাম চেহারাটা দেখার জন্য। দেখলাম বসে আছে, তবে মুখটা নিচের দিকে নামানো। ততক্ষণে বাস ছেড়ে দিয়েছে শাপলাচত্বর থেকে। আমার কাছে ব্যাপারটা ফাজলামিই মনে হলো। এই ফাজলামির কোন মানে নাই। অর্থহীন ফাজলামি আমি পছন্দ করিনা। ভাবছি লোকটা কে হতে পারে? কে সে? আমার কোন ফ্রেন্ড? এটা হওয়ার সম্ভাবনা জিরো। এমন করার মত কাউকে আপাতত পাচ্ছিনা। খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা প্রায় সবাই মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করেন। একমাত্র আমিই ফুটপাত দিয়ে হাটি। কোন ভন্ড পীর? সম্ভাবনা শতকরা ফাইভ। নাকি জ্বীনের বাদশা খ্যাত কোনোও প্রতারক?

হতে পারে। ঢাকা শহরে প্রচুর প্রতারক আছে। এরা বিভিন্ন কায়দায় প্রতারণা করে। অনেক দিন আগের ঘটনা। প্রায় ভুলেই গেছি। ছ’মাস পর এক শীতের রাতে কাথামুড়ি দিয়ে বসে একটি বিদেশী থ্রিলারের বই পড়ছি। ঠিক এসময় এলো ফোনটা। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জানালো,
– আমি মৃত মানুষের সাথে ফোনে কথা বলি।
বললাম,
– হ্যা মনে পড়ছে। আমার কানের কাছে কথাটা বলেই গাজীপুর চলে গিয়েছিলেন। এখন কোথায়, আজিমপুর গোরস্তানে?
– গোরস্তানে যাব কেনো? আমার ঘরেই আছি।
– মৃত মানুষের সাথে কথা বলতে হলে তো গোরস্তানে যেতে হবে। তাই বললাম।
লোকটি হো হো করে হেসে উঠলো। বললো,
– আমি কথা বলি ফোনে। গোরস্তানে যাওয়া লাগেনা।
বললাম,
– মৃত মানুষদের কবরে কবরে মোবাইল ফোনটাও কি আপনি নিজেই কিনে সাপ্লাই দিয়েছেন?
বলল,
– বোকামিপুর্ণ কথা অন্তত আপনার কাছ থেকে আশা করিনি।
– কিন্তু আপনি কে? আমাকে এসব শোনাচ্ছেন কেনো? আর মৃতদের সাথেই বা কিভাবে কথা বলেন। আপনার মাথায় সম্ভবত গণ্ডগোল আছে। সাইকোলজিস্ট এর কাছে যেতে হবে।
বললাম আমি।

আবারো রহস্যপূর্ণ হাসি ভেসে এলো। বলল,
– আমি মৃতদের সাথে কিভাবে কথা বলি জানতে চান?
আমি আকুল হয়ে বললাম,
– হ্যা জানতে চাই। আমাকে লাইনে রেখে কনফারেন্সে কথা বলুন। শুনি। আপনার প্রতারণা ঠিকই ধরে ফেলব।
বলল,
– মোবাইল কনফারেন্সের দরকার নাই। আমি এখন যার সাথে কথা বলছি সেও একজন মৃত মানুষ। লাইভ শুনুন এবং ইচ্ছা হলে কথাবার্তা রেকর্ড করেও রাখতে পারেন।
রেগে গেলাম আমি। লোকটা আমাকে মৃত মানুষ বলছে। বললাম,
– ফাজলামি করার সীমা থাকা উচিত। আমাকে মৃত বলার মানে কি?
সে বলল,
– শুধু আপনি নন। এই সময়ের বেশীরভাগ মানুষই মৃত মানুষ। যাদের মধ্যে প্রতিবাদ করার ভাষা নাই, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝলসে উঠেনা, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাড়ায়না তারা তো মৃত মানুষ।
তাৎক্ষণিক হতচকিত আমি। বলে কি লোকটা!

সে আবার বলল,
– আপনি বলতে পারেন দেশে এতগুলো রাজনৈতিক দল আছে, এনার্জেটিক যুবশক্তি আছে এরা কি মৃত? যে যৌবনে লড়াই নেই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নেই, সেই যৌবন মৃত, অসাড়, জম্বি লাশ। চারদিকে কত অনাচার – অবিচার হচ্ছে, সরকার বাহাদুর থেকে শুরু করে আমলা পর্যন্ত ক্ষমতা দাপট দেখিয়ে চলছে। দুর্নীতি, দুঃশাসনে দেশ সয়লাব। কই কেউ তো কথা বলেছে না। এই যে নিত্যদিন এতো ধর্ষণ, নির্যাতন আর অন্যায় হচ্ছে আপনারা মৃত মানুষ না হলে একটিবার টু শব্দটি পর্যন্ত করছেন না। জীবিত মানুষেরা কথা বলে । প্রতিবাদ করে। বুলেটের সামনে বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
রহস্যময় মানুষটি লাইন কেটে দেয়ার আগে বলল,
– আমাকে জানতে গিয়ে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। মৃত মানুষদের এত কৌতুহল থাকা ঠিক না।
গায়ে চিমটি দিলাম। ব্যাথা লাগে। বেঁচে আছি। অথচ লোকটা বলল আমরা মৃত! রহস্যময় মানুষটিকে জানার আগ্রহ সত্যিই এই মুহুর্তে একটুও নাই। আমার আগ্রহ আমাকে নিয়ে, আমাদেরকে নিয়ে। আমরা কি আসলেই মৃত?

২৮/০৭/২০২০, ১১.১৪ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *