আসলান (শেষ পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  

আদালতে তোলা হলো তিন অপরাধীকে। ইতিমধ্যে কয়েকবার বয়ান পাল্টানোর চেষ্টা করেছে তারা, একেক সময় একেক রকম মনগড়া গল্প ফেঁদেছে। পুরো প্রদেশের একজন উকিলও তাদের পক্ষে দাঁড়াননি, যিনি ওদের হয়ে মামলা লড়েছিলেন তিনিও এই অপরাধীদের আত্নীয় বলেই মামলাটা নিয়েছিলেন। তুরস্কে মৃত্যুদণ্ডের প্রথা নেই, সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্ত এই অমানুষগুলোকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার জন্যে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ করেছেন নারীরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ দিয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন মানুষ। তাতে অবশ্য আইন পুরোপুরি বদলায়নি, তবে ধর্ষণ বা খুনের আসামীরা ভালো ব্যবহারের জন্যে সাজা মওকুফের তালিকা থেকে বাদ থাকবেন, এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। শেষমেশ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজাই পেয়েছিল তিন অপরাধী। তবে স্রষ্টা মানুষের অপরাধের বিচারের খানিকটা দুনিয়াতেই করে ফেলেন কখনও কখনও। জেলখানায় সুফী, তার বাবা আর বন্ধু ফাতিহকে সারাক্ষণই থাকতে হতো প্রচণ্ড রকমের একটা ভয়ের মধ্যে। সাধারণ কয়েদীরা দুই চোখে দেখতে পারতো না ওদের তিনজনকে। মাঝেমধ্যেই কয়েকজন মিলে চড়াও হতো ওদের ওপর।

২০১৬ সালের ১১ই এপ্রিলে গুলতেকিন আলান নামের পঞ্চাশ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক কয়েদি বন্দুক নিয়ে গুলি করেন সুফী আর তার বাবাকে। দুজনকেই হাসপাতালে নেয়া হয়, সেখানে মৃত্যু হয় সুফীর। তার বাবা সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান। নিহত সুফীর লাশটা পাঁচদিন ধরে পড়েছিল হাসপাতালের মর্গে, দাফন করা যাচ্ছিল না। কারণ মারসিন প্রদেশ, যেখানে সুফী আর আসলান দুজনের বাড়ি, সেখানকার লোকজন কোনভাবেই এই খুনীর লাশ এই এলাকায় দাফন করতে দিতে রাজী ছিল না। সুফীর মায়ের শত অনুরোধের পরেও মন গলেনি কারো। সবার এক কথা – এই পাপিষ্ঠের মৃতদেহ এই এলাকার মাটিতে ঠাঁই পেতে পারে না। মৃত্যুর পাঁচদিন পরে এক মধ্যরাতে পুলিশি প্রহরায় অন্য এক এলাকায় নিয়ে একটা অজ্ঞাত স্থানে দাফন করা হয় সুফীর লাশ।

বাংলাদেশে পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়। চারপাশটা কেমন যেন অসুস্থ লাগে। দেড় বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধা, হায়েনাদের করাল গ্রাস থেকে বাদ থাকছে না কেউ। যে পর্দার কথা বলে একটা শ্রেণীর মানুষ মুখে ফেনা তুলে ফেলে, সেই বোরখা পরে বেরুনোর পরেও গণধর্ষণ করে খুন করা হয় তরুণীকে! অথচ ধর্ষণের বিচার হয় না এখানে। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতায় আশকারা পেয়ে যাচ্ছে ধর্ষকেরা। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই উৎসাহী করে তুলছে তাদের। কাল আপনি দশজন ধর্ষকের বিচার করুন, এক হাজার ধর্ষক তাদের ধর্ষকামী চিন্তাভাবনাগুলো আরেকবার প্রকাশের আগে একশোবার ভাববে। কিন্ত বিচারটাই তো হচ্ছে না। তুরস্ক কিংবা ভারতের সামাজিক অবস্থান আমাদের তুলনায় আহামরি ভিন্ন কিছু নয়। অথচ ওরা ধর্ষককে বয়কট করতে পারছে, ধর্ষকের বিচার করে সাজা দিতে পারছে, কিন্ত এই একটা জায়গায় আমরা যোজন যোজন পিছিয়ে আছি বাকীদের চেয়ে। আর এজন্যেই ধর্ষণ থামছে না, থামছে না এইসব নরপশুদের আস্ফালনও।

০৮/০২/২০২০, ০৯.২৯ PM

আসলান (প্রথম পর্ব)

আসলান (দ্বিতীয় পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *