এসপি সাহেবের কুকুর

  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের বাসা থেকে আমার এক খালার বাসা ছিল খানিকটা দূরে। দূরত্বটা এমন যে রিক্সা ভাড়া চল্লিশ পঞ্চাশ টাকা লেগে যেতো। রিকশায় করে যখন খালার বাসায় যেতাম, পথে রাস্তার পাশেই পড়তো ডিসি আর এসপির ডাকবাংলো। কি বিশাল বড় বড় ছিল সে বাংলো গুলো, বাবারে বাবা! সেই বিশাল বিশাল বাংলো দুটো আমাদের মতো ছোটদের জন্য ছিল একেবারে জীবন্ত জাদুঘর। যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে কিন্তু ভেতরে যাবার সাধ্য নেই। একদিন সেই বাংলোর পাশ দিয়ে যাবার সময় বিশাল গ্রিলের ফাঁক দিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। দেখি আমার বয়সী বাচ্চা একটা মেয়ে, ধবধবে সাদা একটা এলসেশিয়ান কুকুর নিয়ে খেলছে। মফস্বল এলাকায় তখন এ ধরনের কুকুর বেশ বিরল। আর খেলার ধরনটাও কেমন আলাদা রকমের। মেয়েটা বলের মত কি যেন ছুঁড়ে দিয়ে খিলখিল করে হাসছে আর কুকুরটা তার ফ্রকের কোনা কামড়ে ধরে সেদিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এবং মেয়েটা বল সদৃশ বস্তু কুড়িয়ে নিয়ে আবারও একই কাজ করছে। অল্প, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দেখা। তাতেই আমার হৃদয়ের অলি গলি ঐ কুকুর ছানা দখল করে ফেলল। চিন্তা করতে লাগলাম, কিভাবে এটার একটা বাচ্চা জোগাড় করা যায়।

স্কুলের বন্ধুদের এ কথা বলতেই বেশ চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেল। আমার ক্লাসের কয়েকজন ছেলে মেয়ে, যাঁদের বাসা এসপির বাংলোর কাছাকাছি, এরকম কয়েকজন মিলে নাকি ঐ কুকুর চুরির প্ল্যান করেছিল। কয়েকবার চেষ্টাও করেছে কিন্তু গার্ডদের জন্য সফল হয়নি। আবারও পরিকল্পনা চলছে, পরবর্তী হামলার। ঘটনা শুনে খুবই চিন্তায় পড়ে গেলাম। এই জিনিসের প্রতি এতো মানুষের নজর! ভাবা যায়! নাহ্ এটাকে আমার পেতেই হবে, তা সে যে করেই হোক। অনেক চিন্তা ভাবনা করে একটা উপায় বের করলাম। এসপির বাসায় চুরি করা আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়। তারচেয়ে ভিক্ষাবৃত্তি ভালো পন্থা। কাজেই আমি সরাসরি ভিক্ষাবৃত্তির পথ ধরলাম। স্কুল শেষ করেই স্কুলের সামনের এক ফোন ফ্যাক্সের দোকানে ঢুকলাম। তখন এসব দোকান থেকে টেলিফোন বা মোবাইলে কল করা যেতো, একটা লোকাল কল পাঁচ টাকা। সেখান থেকে টেলিফোনে ওয়ান সেভেনে কল করে এসপির বাংলোর নাম্বার চাইলাম। এনকোয়ারির ভদ্রমহিলা একটু অবাক হলেন মনে হল কিন্তু লাইন ঠিকই পাইয়ে দিলেন।
: হ্যালো…..।
ওপাশের রাশভারি কন্ঠস্বরে কিছুক্ষণের জন্য একটু অস্বস্তি লাগলো, কথা বলব নাকি লাইন কেটে দেব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
: হ্যালো কে বলছেন?
: জী আস সালামুআলাইকুম।
: ওয়ালাইকুম আস সালাম, কে?
: জী আমি।
: আমি টা কে? কি নাম তোমার?
: জী আমার নাম নীলা।

মিথ্যা বললাম। আগে থেকেই প্ল্যান করা ছিল কোন কিছু জিজ্ঞেস করলেই মিথ্যা বলব। কেন যেন মনে হচ্ছিল এই পুলিশ ভদ্রলোককে ইনফরমেশন ঠিকঠাক দেওয়া উচিত হবে না।
: তুমি কাকে চাচ্ছো নীলা?
: জী, অ্যা.. অ্যা.. এসপি সাহেবকে।
: এসপি সাহেবকে! আচ্ছা বল, আমিই এসপি।
কয়েকবার ঢোঁক গিললাম, কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হল না আমার।
: হ্যালো, হ্যালো, কি কথা বলছো না যে?
: ইয়ে মানে আপনি ভালো আছেন?
: হ্যাঁ ভালো!
: আপনাদের কুকুর ছানাটা ভালো আছে?
: কে বলছো তুমি?
এবার উনাকে বেশ সতর্ক মনে হল। তীক্ষ্ম গলায় উনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন।
: এই মেয়ে, কি নাম যেন বললে? নীলা, কোন স্কুলে পড় তুমি?
আমি স্কুলের নাম বললাম, বলেই দিলাম জিভে কামড়। এ আমি কি করেছি, সত্যি সত্যি নিজের স্কুলের নাম বলে দিয়েছি! এটা তো বলার কথা ছিল না।
: কোন ক্লাসে পড় তুমি?
: জী, ক্লাস নাইনে।
: আচ্ছা, এবার বল, কি যেন বলছিলে কুকুরের কথা?
: ইয়ে আংকেল, আপনাদের এই কুকুরের বাচ্চা হয় না?
: বাচ্চা! সেটা তো হয় কিন্তু এটা তো ছেলে কুকুর, এর হবে না, কেন?
: না মানে, আমার খুব পছন্দ, একটা বাচ্চা হলে নিতাম।
: তুমি কুকুরের বাচ্চা চাওয়ার জন্য ফোন করেছো?
: জী।
: তুমি ভেবেছো চাইলেই পাওয়া যাবে? এটা পালা এতো সহজ না, অনেক খরচের বিষয় আছে, বুঝেছো?
: জী।
: কি বুঝলে?
: বুঝলাম চাইলেই এটা পাওয়া যাবে না, এটা চাওয়ার চাইতে চোরের দলে নাম লেখানো ভালো ছিল।
: কি বললে! অ্যাই মেয়ে, কি বললে তুমি! অ্যাই!
আমি খটাস করে ফোন রেখে দিলাম। বেফাঁস কথা বলে ফেলেছি, উচিত হয় নি। কিন্তু মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেছে।

ব্যাপারটা যে কতটা অনুচিত হয়েছে পরের দিন স্কুলে গিয়েই সেটা বোঝা গেল। এসপি সাহেবের বাসায় আবারও চুরির চেষ্টা করা হয়েছে। চোর এবারও কুকুর নিতে পারেনি ঠিকই তবে বেল্টের সাথে একটা চিঠি ঝুলিয়ে দিয়ে এসেছে। সেখানে লেখা, “শালার এসপি, তুই গু খা।” খুবই অপমানসূচক কথা! বোঝাই যাচ্ছে কুকুর না পেয়ে কিশোর চোরের দল মর্মাহত। তাই সমস্ত আক্রোশ ঢেলে দিয়ে এসেছে সেই চিঠিতে। আর সেই চিঠি এবং গতকালের ফোন কলের সূত্র ধরেই চোর ধরতে পুলিশ এসে হাজির স্কুলে। পুলিশের সাথে হেড স্যারের কি কথা হল জানি না তবে প্রত্যেক ক্লাসে ক্লাসে টিচার রা জেরা শুরু করলেন, স্পেশালি ক্লাস নাইন। যদিও আমি ক্লাস সিক্সে তবু আমার হাত পা কাঁপা কাঁপি শুরু হয়ে গেল। চোরের দলের কয়েকজনেরও মুখ পাংশু বর্ণ ধারণ করল, আর সবচেয়ে বেশি ভয় পেল আমাদের ক্লাসের কঠিন সুন্দরী মেয়ে, তানিয়া। এই মেয়েটাও যে চোরের দলে ছিল, আমি জানতাম না। সব ক্লাসেই জেরা চলল, তেমন কিছুই বের হল না। আমরা মোটামুটি পিচ্চিদের গ্রুপে পড়ি বলে আমাদের ক্লাসটিচার তেমন জোর দিয়ে কিছু বললেনও না, হালকা একটা ঘোষনা দিয়েই ছেড়ে দিলেন, যে কেউ কিছু জানলে যেন উনাকে জানায়। আমরা পার পেয়েই যাচ্ছিলাম কিন্তু তানিয়া গরুটার জন্যই শেষ রক্ষা হল না। বেকুব টা ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদতে কাঁদতে স্যার কে সব বলে দিল।

স্যার সবকিছু শুনলেন। শুনে অনেকক্ষণ তানিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আমাদের অবাক করে দিয়ে বললেন,
– তোরা আজকালকার মেয়েরা এরকম কেন? তুই দেখতে সুন্দর, তুই হবি মানুষের মন চোর। তা না, তুই হলি গিয়ে কুত্তা চোরের লীডার। এইটা কোন কথা! যা গিয়ে বস, যা। আর কোন দিন যদি শুনি এসপির কুকুর চুরি হয়েছে, তোদেরকেই ধরব, মনে রাখিস।
এই ঘটনার পর এসপির কুকুর চুরি করার আর কোন চেষ্টা করা হয়নি আর আমারও কুকুরের বাচ্চা পাওয়া হয়নি। তবে সেদিন স্যারের কথাটা খুব মনে ধরেছিল, মাথায় গেঁথে গিয়েছিল একদম,
– “তুই দেখতে সুন্দর, তুই হবি মানুষের মন চোর, তা না, তুই হলি কুত্তা চোরের লীডার।
এইতো কিছুদিন আগে শুনলাম, সুন্দরী এক কর্মকর্তা নাকি চাল চুরি করে ধরা পড়েছিলেন। উনাকে দেখেও আমার ছোটবেলার সেই স্যারের কথাই মনে পড়ছিল। স্যার বেঁচে থাকলে নিশ্চিত বলতেন,
– আরে আপনি সুন্দর মানুষ, আপনে হবেন মন চোর, তা না হয়ে হলেন কিনা চাল চোর। দুর, এইটা কোন কথা!

২২/০৫/২০২০, ১০.০২ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *