ওথেলো সিন্ড্রোম

  •  
  •  
  •  
  •  

পৃথিবীর ভয়ংকরতম মানসিক রোগের রোমান্টিকতম নাম। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডি নাটক ওথেলো, দ্য মুর অফ ভেনিস এর নায়ক ওথেলোর নামেই এই রোগের নামকরন করেন মনোবিজ্ঞানীরা। কৃষ্ণাঙ্গ সেনাপতি ওথেলো মিথ্যা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তার স্ত্রী ডেসডিমনাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন এবং পরে যখন জানতে পারেন স্ত্রীর প্রতি তার এই বিশ্বাস অমূলক ছিল তখন নিজেও আত্মহত্যা করেন। ওথেলো সিন্ড্রোম বা প্যাথলজিক্যাল জেলাসি নারী – পুরুষ উভয়ের মধ্যেই দেখা যায়। এই রোগে নারীরা কিংবা পুরুষরা তাঁদের সঙ্গিনী বা স্ত্রীকে সারাক্ষণ সন্দেহ করতে থাকেন, ভাবেন তাঁদের স্ত্রী অবিশ্বাসী, ব্যাভিচারিনী এবং সঙ্গিনীকে হারানোর ভয়, ইন্সিকিউরিটি থেকে তাঁদের মধ্যে নানা ধরনের বিহেভিওরাল ডিযঅর্ডার দেখা দেয়। যেমন, তিনি অভিযোগ করতে থাকেন যে তার বউ তার থেকে অন্যদেরকে বেশী এটেনশন দেয়! রং নাম্বার, এক্সিডেন্টাল কল থেকে শুরু করে সমস্ত ফোন কল নিয়ে জেরা করতে থাকে। পার্টনারের সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ব্যাবহার নিয়ে তাঁদের চরম আপত্তি থাকে। সারাক্ষণ ভাবে তার বউ বা প্রেমিকা অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জরিয়ে পড়ছে। সারাক্ষণ জানার চেষ্টা করে বউ কোথায় আছে, কার সাথে আছে।

পার্টনারের এর ফ্যামিলি এবং ফ্রেন্ডসদের সাথে মেলামেশার ব্যাপারেও সে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, সে ডিসাইড করে দেয় কার সাথে মেশা যাবে বা যাবে না। স্ত্রীর পারসোনাল হবি বা কাজের জায়গায় সে বাধা সৃষ্টি করে, বাড়ীর বাইরে যাবার উপর কড়া নজরদারি শুরু করে। পার্টনার এর পোশাক আশাক, সাজসজ্জা থেকে শুরু করে তার সামাজিক জীবন সব সে নিয়ন্ত্রণ করে। সন্দেহ থেকে ভারবাল, ফিজিক্যাল বা সেকচুয়াল এবিউজ করে এবং প্রতিবাদের সম্মুখীন হলে তার সন্দেহ আরও সুদৃঢ় হয়। আমি মোটা দাগে কিছু লক্ষণের কথা বললাম, ব্যক্তিবিশেষে এর সাথে আরও অনেক লক্ষণ যোগ হতে পারে বা লক্ষণ আরও ওরস হতে পারে। এক্সট্রিম কেইস সিনারিওতে স্বামী বা প্রেমিক তার স্ত্রী বা প্রেমিকাকে খুন, নিজে আত্মহত্যা করে ফেলতে পারেন, বা ওথেলোর মত দুটোই একসাথে করতে পারেন।

অতএব যারা নিজেদের স্বামীর বা প্রেমিকের মধ্যে এই সব লক্ষণ দেখে নিজেকে অসম্ভব ভাগ্যবতী মনে করেন, ভাবেন কোন পুণ্যের ফলাফল হিসেবে এমন প্রেমিক পেয়েছেন তারা আসলে ভয়ঙ্কর এক মানসিক রোগীর সাথে বসবাস করছেন, যে আপনার এবং তার নিজের দুইজনের জীবনের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই উপরের লক্ষণের সাথে কোন লক্ষণ মিলে গেলে ভালবাসায় গদগদ না হয়ে অনতিবিলম্বে তাকে সাইক্রিয়াটিস্ট/কাউন্সিলারের এর কাছে নিয়ে যান। উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিজের জীবনের নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনেন। আফসোস, শেক্সপিয়ায় সাহেব এই নাটক লেখার আগে এই রোগের নাম কেও জানতই না। এমনকি শেকসপিয়ার সাহেব জানলেও হয়ত নাটকের পরিসমাপ্তি হত অন্যভাবে। নিষ্পাপ ডেসডিমোনা বেঁচে থাকত আর তার ঈর্ষাকাতর স্বামী ওথেলো থাকত এসাইলামে। মনে রাখবেন, ভালবাসা কোন জেলখানা না যে তাতে বন্দী হয়ে থাকতে হবে। ভালবাসা আকাশের মত, হাত পা ছড়িয়ে উড়তে শেখার নামই ভালবাসা।

১৯/১২/২০১৯, ১১.২২ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *