কলিমউদ্দীনের বউ (শেষ পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  

ক্যান্টিন হতে বের হয়ে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে ফের হাসপাতালে ঢুকব দেখি সেই গোল চত্বরে বৃদ্ধার পাশে এখন বৃদ্ধ বসে আছেন, এক হাতে দুটো সবুজ রংয়ের সস্তা আইসক্রিম। আরেকটু সামনে যেয়ে দেখি বৃদ্ধা তখনো কাঁদছেন, আর কলিমউদ্দীন সাহেব অন্য হাতে বউয়ের ভেজা গাল মুছে দিচ্ছেন। দ্বিপ্রহরের কড়া রোদ তখন মাথার উপর। ঈশানকোণে এক টুকরো মেঘ জমেছে যদিও। রোদের তীব্রতা তাতে কমেনি। পশ্চিম দিকে মর্গের পাশে থাকা আকাশমনি গাছটা হতে একটা বেনে বউ পাখি ডাকল কি ডাকল না, আমি মুগ্ধ চোখে বৃদ্ধ দম্পতিকে দেখতে থাকি। দম্পতিদের কাছে গিয়ে বললাম,
– কী চাচা কই হারায়ে গিয়েছিলেন?
– একটু পলায়ে ছিলাম। দেখতাছিলাম আমারে না পালি আপনার চাচী কী করে। কেমন কানতাসিল। হিহি।
– কথা বলবেন না আমার লগে।
বৃদ্ধার কন্ঠ শুনে বোঝা গেল বাড়ি গেলে চাচার আজকে দফারফা হয়ে যাবে।

– আইসকিরিম খাও বউ। ও বউ।
আমি মৃদু হাসলাম। কে বলবে এনারা নববিবাহিত দম্পতি নয়। ছেলেমানুষের মত ঝগড়া করছেন, মান অভিমান করছেন।
– তুমি আমারে তহন বাহির করে দিলা ক্যান?
– শরমের কথা আপনের সামনে বলা যায়? আস্তাকফিরুল্লাহ।
– আচ্ছা আইসকিরিম খাও।
আমি হাসলাম। জীবন সায়াহ্নে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষ, একটা জীবন এক সাথে হাতে হাত রেখে কাটিয়ে দেওয়া দুজন মানুষ, সবুজ রংয়ের সস্তা আইসক্রিম খেতে খেতে ফোঁকলা মুখে হাসছেন।

বার্ধক্যে জরাজীর্ণ একের হাতের উপর অন্যের হাত রাখা, দুর্বল হাতে সেই হাতখানা শক্ত করে ধরে রাখা। মৃত্যু ছাড়া সে বাঁধন ছিন্ন করবে সাধ্যি আছে কার? দৃশ্যটা পেছনে ফেলে অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে থাকি। অন্যমনস্ক হয়েই ব্যাগ হতে মুঠোফোন বের করলাম। সকাল সাড়ে এগারটায় বার্তা এসেছে,
– ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়েছি।
ফোনের ইনবক্সে অন্তত শ খানেক বার্তা এসেছিল এর আগে, যার সারাংশ ছিল –
“আরেকবার ভেবে দেখবে, প্লিজ?”
থমকে গেলাম খানিক। আকাশের রং বদলাল কী ভীষন দ্রুত। ছায়াময় হয়ে উঠেছে আমার চারপাশ। এখন একটু হাহাকার নিয়ে হাত বাড়ালেই প্রকৃতি সে হাত ভরিয়ে দেবে বিরামহীন বর্ষণে। একসময়কার প্রিয় নাম্বারটায় ফোন দিলাম আমি। গলা কাঁপছে। রিং বাজতেই অন্য পাশ হতে আসাদ ফোন ধরবে। ওকে আজ বলতে হবে অনেকদিন এক সাথে আইসক্রিম খাইনি।

২৪/০৫/২০২০, ০৩.৫০ PM

কলিমউদ্দীনের বউ (প্রথম পর্ব)

কলিমউদ্দীনের বউ (দ্বিতীয় পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *