কাঁদতে হয় লুকিয়ে

  • 1
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

মাঝে মাঝে বোবা কান্নার দলা গলার মাঝে আটকে যায়, দুচোখে জল চলে আসে। কিন্তু পরক্ষনেই সেই চোখের পানি কেউ দেখে ফেলার আগেই, কেউ বুঝে ফেলার আগেই মুছে ফেলি। আসলে তারা জানে, ঘরের বড় ছেলেকে এভাবে কাঁদতে হয় না। কাঁদতে হয় লুকিয়ে, আড়ালে, যাতে কেউ না দেখে। চোখের পানি মুছে আবার তাদের ঘরে ফিরতে হয়। কিছু মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য, তাদের শক্তি হওয়া জরুরী।
– এই ঈদে “বড় ছেলে” নামক নাটকের শেষ মন্তব্য এটা। দুপুরের খাবার শেষ করে মায়ের খাটে বসে টিভির রিমোটে চ্যানেল চেঞ্জ করতে করতে এই নাটকে চোখ আটকে যায়। কিছুক্ষণ দেখার পর ছোট ভাইটা খুশির দিনে এরকম কষ্টের নাটক প্রচারের জন্য বিরক্তি প্রকাশ করে। আমি ভাবি নাট্যকারতো আমার জীবনে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোকেই সুন্দর করে সাজিয়ে বলেছে এখানে। ছোট ভাইটাকে বলা হয়না সেই কথাগুলো।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাবার দেয়া অল্প টাকায় মাস কাটাতে কষ্ট হতো প্রচন্ড। টিউশনি করে সেটাও নেয়া কমিয়ে দেই। রিক্সায় একটু ঘুরে একসাথে বসে একবেলা খাবারের বিল দেয়ার সামর্থ্য ছিল না বলে প্রেমটাই করা হয়ে উঠেনি। পাশ করার পর কাঙ্খিত পদে চাকুরীর পরীক্ষার ভাইভা দিয়ে চাকুরী পেতে ব্যার্থ হয়ে একটা চাকরীর জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছি। স্কুল মাস্টার বাবার প্রতিষ্ঠিত ছাত্রদের দরজায় দরজায় অপেক্ষা করেছি শত-শত দিন একটু অনুগ্রহের আশায়। অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে বারান্দার বেঞ্চিতে কেটেছে রাতের পর রাত। কয়টা টাকা বাচানোর জন্য দুপুরে না খেয়ে থেকেও প্রশ্নের উত্তরে হাসি মুখে বলেছি ‘খেয়ে নিয়েছি’ কিংবা ‘সময়ইতো পাইনি’ অথবা ‘ক্ষিদে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, একেবারে রাতেই খেয়ে নেবো’।

৫/১০ টাকা ভাড়া বাচানোর জন্য কয়েক কিলোমিটার হেটেছি দুপুরের কড়া রোদে। বাবার মৃত্যুর পর একফোটা জল আমার চোখ থেকে পড়েনি কারণ ক্লাশ নাইনে পড়া আমার কিশোর ছোট ভাইটা আর আমার অসহায় মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, আমার চোখের জল তাদের দুর্বল করে দিতে পারে ভেবে চোখের জলের আড়ালে বুকের রক্তক্ষরণটাকেই বেছে নিয়েছিলাম সেদিন। এরকম হাজারো কষ্টের অভিজ্ঞতা আর তা লুকিয়ে হাসিমুখে সকলের সাথে মেতে থাকাতেই ঘরের বড় ছেলেদের অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হয় প্রতিদিনের জীবনে। আমার বাবাও ঘরের বড় ছেলে ছিলেন আর আমার ছোট্ট অভিজ্ঞতায় আরো কষ্টের পথ পাড়ি দেয়া একজন মানুষকে জেনেছিলাম তাকে দেখে। হয়তোবা প্রকৃতিই ঘরের বড় ছেলেদেরকে এমনভাবেই তৈরী করে দেয় যে, তারা শত কষ্ট সহ্য করে ঠায় দাড়িয়ে থাকতে পাড়ে, বুক আগলে সকল ঝঞ্জা-বিক্ষুব্ধ বাতাসকে ঠেকিয়ে দেয়ার জন্য যাতে আর সবাই সুখে থাকতে পারে।

২৪/০৭/২০২০, ১১.৩৫ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *