খন্ডচিত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

এবং মৃত্যু বড্ড বেশি সুখের। মৃত্যু এক যন্ত্রণাহীন যাতনা। মৃত্যু আর অবশেষ। রহমান আজ মৃত্যু নিয়ে ভাবছে। ভাবছে প্রেম নিয়ে। রহমানের মনে হয় – মৃত্যুই জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুই প্রেম। ভালোবাসা’র মৃত্যু, প্রেমময় মহান মৃত্যু। জীবন – মরণ এক মিলন বিন্দু। মৃত্যু সত্য তাই সুন্দর; মৃত্যু প্রাকৃতিক তাই নির্ভেজাল। হঠাৎ একটা মুঠোফোনের অভাব বোধ করে যেনো রহমান। কিন্তু মৃত্যুর পর মুঠোফোনের প্রয়োজন নেই। হয়তো প্রয়োজন কিংবা অভাব কোনটাই নেই। জীবন তো অংশ মাত্র; মৃত্যু সমগ্রক। অংশ সমগ্রকের বৈশিষ্ট্যধারী – এজন্যই কি জীবন যন্ত্রণাময়? প্রেম যন্ত্রণাময়? সমগ্রকের আদি-অন্ত নেই; অংশের আছে। তাই জীবন অভাবপূর্ণ।

গীতাঞ্জলীর সমগ্র প্রেমের অংশ মাত্র পেয়েছিল বলে বিরহ কাতর হয়ে পড়ে সে। এই গীতাঞ্জলী একদিন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। গ্রামের অদূরে একটি বিশাল কাঁঠাল গাছে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে সে। একা নয় দু’জন। রহমান বুঝতে পারেনি সেদিনের বিরহ। আজ সে বুঝতে পারে সেদিনের মানে। আত্মহত্যার মানে; বুঝতে পারে মৃত্যুর মানে। শিফাত আরজিনা, শিরিন ফারিয়া, শামীমা আফরোজ- এরা সবাই গ্রামেরই মেয়ে। রহমান এদের নামের মাঝে সবুজ খুঁজে ফেরে। বারবার ওই নামগুলোতে যেনো শহুরে কৃত্রিমতা নিয়ন আলোয় মুচকি হেসে যায়। বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয়না চাঁদের আলোর রাজসিক ম্লান-মায়াবী হাসির ফোয়ারা। ভীষণ অসহায়বোধ করে রহমান।

গত মাসে দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়ঙ্কর তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে। সিডর। চোখ। বলেশ্বর নদী। দেশের মধ্যাঞ্চল। তান্ডব-লন্ডভন্ড-মহাবিপর্যয়। ত্রাণ – বিদেশি সাহায্য, নৌবহর- রণতরী? মানুষের আহাজারি আর টিভির পর্দায় ‘একই বৃন্তে দুই কুসুম’ এর বৃন্ত কাটতে আসা “অদ্ভুতিদের” পুরনো প্রলাপ নতুন ঢঙে। রহমান আবারো অসহায় বোধ করতে থাকে। রহমানের অসহায় বোধ করতে থাকার এই সময়টাতেই – ঘনকাল জলের দিঘীর পাড়ে লতা আর তমাল; ভালোবাসায় নিবিড়। খোলা আকাশের নিচে ঠিক যতটুকু শালীনতা ততটুকু বজায় রেখে সময় কাটায় ওরা। কোয়ান্টাম পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করছিল ওরা। সময়টা বিকেল। একটা লোক, লুঙ্গি-সবুজ জামা পরা; ওদের সামনে দিয়ে দু’বার হেঁটে গেল। চার-পাঁচটা বোরখা পরা আর তিনটে বালিকা দ্রুত পায়ে হেঁটে যায়। বোরখারা শব্দ করে – ছিঁ. ছিঁ. ছিঁ.? বালিকারা হাত নেড়ে ওদের শুভেচ্ছা জানায়, নারীদের আড়াল করে। ওরা মিষ্টি হাসি দিয়ে গ্রহণ করে নেয়।

নির্জন দীঘির পাড়। দু’এক জোড়া ভালোবাসা; ছড়ানো ছেটানো। তন্ময়, ভাষাহীন এক জগৎ যেনো। লুঙ্গি আর লাল গেঞ্জি পরা লোকটা হঠাতই তমাল – লতাকে ধমক দিয়ে বলে,
– “এইডে কি পার্ক?”
তমাল বলে,
– “আপনাদের সমস্যা হলে আমরা চলে যাব।”
লোকটা আবার বলে,
– “এইডে কি পার্ক? তুমরা কারোরই মাইনছো না। সোমকে দিয়ে মাইয়েছেইলে গেলো; কিছুই যে মনে কত্তিছোনা?”
সবুজ জামাওয়ালাটা গালে ঠাস করে চড় মারার মত বলে ওঠে,
– “এই শালা তোর বাড়ি কোনে; এদিকে আয়?”
– “গোরস্তান পাড়া। কেনো?”
তমাল শান্তভাবেই জবাব দিয়ে জানতে চায়।
সবুজ জামা পরা লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বলে,
– “ওরে সোহাগের কুটুমরে। তোরেই তো খুঁজতিছি? আইজ তোরে গোরস্তানে পাটাবো। এই তোরা বান শালারে।”
তিন তিনটে বিশাল অজগরের সামনে অসহায় একজোড়া পাখি।

এরই মধ্যে একটা লোক লতার হাত টানাটানি করতে থাকে। লতা স্তব্ধ। তবুও হাতটা ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে। লোকটা লতার পার্সটা ছিনিয়ে নেয়। এরপর কানের দুল, হাতের চুঁড়িটা, পায়ের মল। তমালের মানিব্যাগ আর মোবাইল, হাতের ঘড়ি। বলেশ্বর নদীতে যেনো সিডরের চোখ ওঠা শুরু হল। তমালের থ্যাঁতলানো নিথর দেহটা দীঘির জলে। আর লতা? রক্তাক্ত। পৈশাচিকতার অনবদ্য শিকার। সদর হাসপাতালের মর্গে পাশাপাশি দুটো লাশ। মাছিরাই ওদের শেষ শ্রদ্ধা জানায়। ফুল তো ফুটে ঝরার জন্যই। হউক না তা অবেলায়। সংবাদে শিরোনাম – “অসামাজিক কাজে লিপ্ত কপোত-কপোতি গণধোলাইয়ে নিহতঃ তদন্ত চলছে”। রহমান আবার অসহায় বোধ করতে থাকে।

১১/০৬/২০২০, ০৬.৫৭ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *