গুজব

  •  
  •  
  •  
  •  

কিছু ঘটনা আমরা ঐতিহাসিকভাবে প্রকৃত ঘটনা হিসেবে বলেই জানি। কিন্তু আদতে সেগুলো গুজব কিংবা আংশিক সত্য। রইল এমন চারটি ঘটনার কথা।

বাংলায় আমরা যেমন বলি, ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’। প্রবাদবাক্যটি ইংরেজিতে তেমনি বলা হয় ‘নিরো, ফিডলড হোয়াইল রোম বার্নড’। অর্থাৎ রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম যখন আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যাচ্ছিল, খামখেয়ালি রাজা নিরো (৩৭-৬৮ সাল) তখন প্রাসাদে বসে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। যদিও বেহালার বদলে বাংলায় বলা হয়, ‘রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল’। কিন্তু ইতিহাস বলে, নিরো তখন রোমেই ছিলেন না, তিনি তখন শহরের ত্রিশ মাইল দূরে অ্যান্টিয়ামে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে বেহালা নামের বাদ্যযন্ত্রের প্রচলনই হয় একাদশ শতাব্দীতে, নিরোর মৃত্যুর প্রায় ১ হাজার ১০০ বছর পর। তাই সে যুগে নিরোর বেহালা বাজানোর প্রশ্নই আসে না!

“সম্রাট নিরো বেহালা বাজাননি”

নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের চিরচেনা গল্পটা অনেকটা এমন, ‘একদিন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন (১৬৪৩-১৭২৭ সাল) একটি আপেল গাছের নিচে বসে ছিলেন। এমন সময় একটা আপেল তাঁর মাথার ওপর এসে পড়ে। তখন থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করেন, আপেলটা তাঁর মাথায় পড়ল কেন? ওপরের দিকে গেল না কেন?’ মজার ব্যাপার হচ্ছে, এখন পর্যন্ত নিউটনের কোনো জীবনী বা কোনো দলিল-দস্তাবেজে তাঁর মাথায় আপেল পড়ার এই গল্পের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এই গল্প প্রথম সামনে আসে নিউটনের বন্ধু উইলিয়াম স্টুকলির লেখা নিউটনের জীবনী থেকে, যেটি প্রকাশ পায় ১৭৯২ সালে। স্টুকলি সেখানে লিখেছিলেন,
– ‘মাধ্যাকর্ষণের ধারণাটা নিউটনের মাথায় প্রথম আসে একটি গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখে। সেদিন তাঁকে বেশ চিন্তামগ্ন দেখাচ্ছিল।’
এখানে কোথাও উল্লেখ নেই যে নিউটনের মাথায় আপেল পড়েছিল। নিউটনকে নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন কোনো গবেষকও কোনো দিন এই দাবি করেননি।

“আপেলটা নিউটনের মাথায় পড়েনি”

ফরাসি বিপ্লব নিয়ে প্রচলিত একটি গল্প অনুসারে, সে যুগের ফ্রান্সের রানি মারি আঁতোয়ানেৎকে (১৭৫৫-১৭৯৩ সাল) যখন জানানো হয় যে তাঁর প্রজাদের ঘরে খাওয়ার জন্য রুটিও নেই, তিনি নাকি তখন বলেছিলেন,
– ‘তাহলে ওদের কেক খেতে বলো।’
বিপ্লবের আগমুহূর্তে ফ্রান্সের শ্রেণিবৈষম্য কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তাঁর উদাহরণ হিসেবে এই গল্পকে টেনে আনা হলেও, প্রকৃত সত্য হচ্ছে রানি আঁতোয়ানেৎ কখনো এমন কথা বলেননি। এই বিখ্যাত উক্তির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৭৬৭ সালে প্রকাশিত ফরাসি দার্শনিক রুশোর বই দ্য কনফেশনস-এ। রুশো তাঁর বইতে কোনো নাম উল্লেখ না করে লিখেছেন, ‘এক সুন্দরী রাজকুমারী’ এ কথা বলেছিলেন। বইটি যখন প্রকাশ পায়, রানি আঁতোয়ানেৎ তখন কেবলই ৮ বছরের বালিকা, থাকতেন তাঁর জন্মভূমি অস্ট্রিয়াতে। তাই তাঁর পক্ষে এমন উক্তি করার সুযোগই ছিল না।

“মারি আঁতোয়ানেৎ প্রজাদের কেক খেতে বলেননি”

চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের (১৮৫৩-১৮৯০ সাল) নিজের বাঁ কান কেটে ফেলার গল্প নিয়ে কম হইচই হয়নি। কোনো কোনো সূত্রের দাবি, মানসিক অস্থিরতার মধ্যে তাঁর বন্ধু পল গগ্যাঁর সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে জেদ করে নিজের কান কেটে ফেলেছিলেন ভ্যান গঘ। আবার অন্য একটা সূত্রের দাবি, নিজের ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েনে এই কাণ্ড ঘটান ডাচ এই চিত্রশিল্পী। যে কারণেই হোক, ভ্যান গঘ তাঁর বাঁ কানের ওপর কাঁচি চালিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে তার শেষ হয়েছিল পুরো কান বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে না, বরং কানের নিচের একটি অংশ কেটে ফেলেছিলেন তিনি!

“ভ্যান গঘ তাঁর পুরো কান কাটেননি”

০৪/০৭/২০২০, ১১.০৬ PM

[রিডার্স ডাইজেস্ট এবং হিস্ট্রি ডট কম অবলম্বনে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *