ঘুমের আমি ঘুমের তুমি

  •  
  •  
  •  
  •  

রাতে বিছানায় শুয়ে, কতক্ষণ ঘুমের অপেক্ষা করার পর আপনি ব্যাপারটাকে, “জাস্ট ঘুম না আসা” থেকে “ইনসমনিয়া অ্যাটাক” পর্যায়ে উন্নীত করেন? ইনসমনিয়া সোজা ব্যাপার নয়, কাজেই সেটা নিয়ে ইয়ার্কি মারা আমার উদ্দেশ্য নয়। ইনসমনিয়া আমি দেখেছি, তার পাল্লায় পড়ে একটা লোক জ্যান্ত অবস্থাতেও যে আধমরা হয়ে থাকতে পারে তাও দেখেছি। হয়তো সেই জন্যই মাঝে মাঝে সারারাত ঘুম না এলেও আমি কিছুতেই স্বীকার করতে চাইনা যে এটা ইনসমনিয়া গোছের কিছু হতে পারে। নিজেকে বুঝিয়ে দিই, হবেই তো। সারাদিনে অত কাপ চা খেলে ঘুম আসাটাই অস্বাভাবিক। এখন সেটা সত্যিও হতে পারে আবার ডিনায়াল-ও হতে পারে। আমি জানিনা। মোদ্দা কথা হচ্ছে আজ রাত্তিরে শুতে যাওয়ার ঝাড়া আড়াই ঘণ্টা পরেও যখন ঘুম এলো না, তখন আমি ধুত্তোরি বলে উঠে পড়লাম। ল্যাপটপের ঢাকনা তুলে একবার অবান্তরের স্ট্যাটিসটিকসে চোখ বুলিয়ে নিয়ে গুগল করলাম, “হাউ টু কিওর ইনসমনিয়া?” তাতে যা বেরোল তার নব্বই শতাংশ টোটকা আমার আগে জানা এবং সেগুলোয় কিস্যু কাজ হয়না।

যেমন ধরুন ওই ভেড়া গোনার ব্যাপারটা। প্রথমত, আপনাদের কথা জানি না, আমার মতো গ্রাম্য পাবলিকের পক্ষে ভেড়া কল্পনা করা অত সহজ নয়। পাল পাল ভেড়ার চাইতে পাল পাল ছাগল কল্পনা করা আমার পক্ষে সোজা। কিন্তু সমস্যার সেখানেই শেষ নয়। শুধু ছাগল কল্পনা করলেই তো হবেনা, সবুজ মাঠ কল্পনা করতে হবে, সাদা বেড়া কল্পনা করতে হবে, সেই বেড়া টপকে একটার পর একটা ছাগলকে লাফ দিইয়ে দিইয়ে এদিক থেকে ওদিকে পাঠাতে হবে। তারপর সেই ছাগল গুনতে হবে, তাতে নাকি ঘুম আসবে। এরপর মাঠটা কীরকম কল্পনা করবেন, সমতল না ঢেউ খেলানো; বেড়াটার প্যাটার্ন কীরকম হবে, সিম্পল না কল্কাকাটা না জাফরি; ছাগলগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় যাচ্ছে, যারা যাচ্ছে তারাই কি ফিরে এসে আবার লাফাচ্ছে, নাকি ওয়ান ওয়ে ট্র্যাফিক-সেসব খুঁটিনাটির কথা তো ছেড়েই দিন।

এতো কিছু ভাবতে গেলে আমার ঘুম আসার বদলে আরও চটকে যায়। যারাই আমার ঘুমের সমস্যার কথা শোনেন, একটা না একটা মোক্ষম দাওয়াই বাতলে দেন। যেটা প্রয়োগ করলে নাকি এমন ঘুম আসবে, যে ঘুম না আসানোর জন্য আবার ওষুধ খুঁজতে বেরোতে হবে আমাকে। আমি মোটামুটি সব দাওয়াই-ই ট্রাই করে দেখেছি। খাটে শুয়ে শুয়ে নিজের ওজন এমন বেশি কল্পনা করেছি যেন আমি বিছানা ভেদ করে, মেঝে ভেদ করে মাটির ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছি। অথবা মুখের সমস্ত মাংসপেশি ঢিলে করে, চোখ কপালে তুলে, আধখোলা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ফোঁসফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে দেখেছি। আর মনে মনে ভেবেছি ভাগ্যিস আমার রুমমেট নেই, থাকলে আমার এই মূর্তি দেখে তার পিলেটা কীরকম চমকাত। কিছুতেই কিছু কাজ হয়নি। কেউ কেউ বলেছিলেন, ঘুমোতে যাওয়ার আগে উষ্ণ গরম দুধে মধু দিয়ে খেলে নাকি কাজে দেয়। হয়তো দেয়, কিন্তু সারাদিন উপোস দিয়ে, রাত্তিরবেলা মধু খেয়ে ডায়েটিং মাটি করতে পারছিনা আমি। সরি। কাজেই ওই টিপসটা কাজে লাগিয়ে দেখা হয়নি।

শোনামাত্র মা অবশ্য বলেছেন, ওইটাই নাকি অব্যর্থ টোটকা ছিল। “নিজের ভালো নিজে না বুঝলে কেউ কি কিছু করতে পারে সোনা?” গোমড়া গলায় অভিযোগ করেছেন। সে করুন গে, আমি ওই রাস্তায় নেই। আমার সেইজন্য সেসব লোকেদের দেখে খুব হিংসে হয় যারা যেখানে সেখানে যখন তখন শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। সুদীপ্তর এক বন্ধু নাকি পরীক্ষার হলে পৌঁছনো আর প্রশ্নপত্র পাওয়ার মাঝখানের সময়টুকুতেও ঘুমিয়ে পড়ত। ভাবুন একবার। আমাদের শিবলিরও ঘুম নিয়ে ঝামেলা নেই। মোটামুটি একটু ঘাড় কাত করার মতো জায়গা পেলেই হল। সম্রাটদারও না। ইন ফ্যাক্ট, সম্রাটদা আমাদের প্যাটেল স্টোরসে নামিয়ে দিয়ে কতদিন পার্কিং লটে ঘুমিয়ে নিয়েছে, “তোরা এসে ডেকে দিস” বলে। আমরা সবাই তখনও ঠেলাঠেলি করে পেছনের দরজা দিয়ে নামতে পারিনি, এদিকে সম্রাটদা সিট হেলিয়ে নাক ডাকতে শুরু করেছে।

লাক্কি বয়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি। আমার মা অবশ্য বলেন, শুয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে ঘুম আনার সাধনা না করে সেই সময় অন্য কিছুর সাধনা করলে সময়টা কাজে লাগে। তাই আমিও শুয়ে না থেকে উঠে পড়ে এই পোস্টটা লিখে ফেললাম। মা অবশ্য এটাকে সাধনার গোত্রে ফেলবেন কিনা সন্দেহ আছে আমার। তবুও। আপনারা ঘুমের ব্যাপারে কে কেমন? রিপ ভ্যান উইঙ্কল নাকি র‍্যান্ডি গার্ডনার? খুঁজে বের করুন, নিজেকে জানুন।

২৭/০৫/২০২০, ০৯.০০ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *