টাকা মানি, মানি টাকা

  •  
  •  
  •  
  •  

“মন! মন আবার কি? টাকা ছাড়া মন কি? টাকা ছাড়া আমাদের মন নাই; টাঁকশালে আমাদের মন ভাঙ্গে গড়ে!” বঙ্গিমের কমলাকান্তের উক্তি এটি। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠতম অবদান এই মন, যা টাকশালে ভাঙে, গড়ে। টাকা স্বর্গ, টাকা ধর্ম, টাকাই জপ তপ ধ্যান। অটোমোবিল ও স্কাইস্ক্রেপার যুগে মেট্রোপলিটন মহানগরে আর কোন টান মানুষকে টানতে পারে না। এককালে মা ছিলেন স্বর্গাদপি গরীয়সী এবং পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম, পিতাই ছিলেন পরম তপস্যার বস্তু। তখন মানুষের টানে মানুষ চলত, গরুর টানে গাড়ি চলত মাটির পথে। ইট পাথর লোহার পথ ছিল না, বাড়ি ঘর ছিল না, অটোর মতো যন্ত্র মানুষকে প্রচণ্ড বেগে টানত না। মাটির টানে, মানুষের টানে, মানুষ চলত। ক্রমে মাটি থেকে দূরে সরে যেতে থাকলো মানুষ। মাটি থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো মানুষ। কংক্রিটের স্পর্ষে, মাটির স্পর্ষবোধ চলে গেল। গৃহসীমানায় প্রাচীর উঠলো, ছোট প্রাচীর, বড় প্রাচীর। ইটের উচ্চতার আড়ালে মানুশের মনও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

তারপর গ্রামের আলো নিভলো। শহরের কৃত্রিম আলো জ্বললো- সে আলোয় সূর্য, চন্দ্র বা নক্ষত্রের কোন সংগীত নেই। প্রতি সূর্যোদয়ে যে প্রণতি ছিল, সূর্যাস্তে যে আরতীর প্রদীপ জ্বলতো, সে আজ বিলুপ্ত, ম্লান। শুধু যে জলাশয়ের জল শুকোলো তা নয়, হৃদয় শুকোলো। মন হল একমুখী। লোভ ও স্বার্থের সওয়ার হয়ে অর্থের দিকে ধাবিত হল শহরে। লোভের টানে, স্বার্থের টানে, অর্থের টানে, গ্রাম থেকে শহরমুখী হল মানুষ ও মানুষের মন। টাকার যে শুধু চক্রগতি আছে তা নয়, তার অনুভূতি আছে, হ্রদস্পন্দন আছে। টাকার অনুভূতি এবং মানুষের অনুভূতি একাকার হয়ে মিশে গেল। মানবিক ও সামাজিক সম্পর্ক আর্থিক সম্পর্কে পরিণত হল। শহরের পত্তন হল নগদ টাকার উপর। পুঁজিবাদি দুনিয়ার আগ্রাসনে গ্রাম ও শহর একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। মধ্যে এসে মাথা তুলে দাঁড়ালো অভ্রভেদী টাকা। শহর ও গ্রামের মতন দেহ ও মন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এ বিচ্ছেদ আর ঘুঁচলো না, ক্রমেই হাত-পা মেললো।

আগেকার কালেও মোহর ছিল, মুদ্রা ছিল, পয়সা ছিল, কড়ি ছিল। কিন্তু বিনিময়টা প্রধানত ছিল তখন বস্তুর সঙ্গে বস্তুর। পয়সা – কড়ি – মোহর – মুদ্রা কালে ভদ্রে হাত ঘুরতো। সামান্য একটু ঘুরে ফিরে পরম নিশ্চিন্তে গভীর ঘুম দিত সিন্দুকের গহ্বরে। বর্তমান টাকা তা নয়। এর চক্রগতির শক্তি অফুরন্ত। তার যে ঘুমিয়ে থাকারই সময় নেই। সিন্দুক বা হাড়ি-কলসিতে ভরে রাখার সময় নেই, ব্যাংকে সংরক্ষণ করা যায়। আমার নিষ্ক্রিয় টাকা, ইনভেস্টমেন্টের পোষাক পরে অন্যের হাতে গিয়ে সচল হয়ে চলতে থাকে চক্রবৃদ্ধিহারে। কোয়ালিটিকে এক নিমিষেই কোয়ান্টিটিতে পরিণত করা যায়। মানুষের জীবনের সমস্ত উপকরণ – দোষ ত্রুটি, মানবিক – সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম ভক্তি স্নেহ ভালবাসা, পাপ – পূণ্য সবই টাকার বিনিময়-মূল্যে সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়। সমাজটাই বড় একটা মার্কেট প্লেস, মার্কেটে যেমন দ্রব্যমূল্যের তালিকা থাকে, তেমনি সমাজের মার্কেটে বহুবিধ মানুষের মূল্য তালিকা সর্বদাই লটকানো থাকে।

সমাজের জ্ঞানী-গুনি-মানী, প্রেমিক-প্রেমিকা, পিতা-পূত্র, মা-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, উচ্চশিক্ষিত, মধ্যশিক্ষিত, নিম্নশিক্ষিত, পণ্ডিত-মূর্খ সকলের দাম টাকার বিনিময় হিসেবে সমাজের মার্কেটে টানানো আছে। এ টাকার হৃদস্পন্দন আছে, আছে গভীর অনুভূতি। টাকার স্পন্দন আছে, গতি আছে, টান আছে প্রবল। মানুষের বুদ্ধি, বিচারবোধ, বিবেক, মনুষত্ব এই টাকার টানে ভেসে যায়। এবং টাকা দিয়ে মানুষকে মাপা যায়। টাকা যেমন টাকশালে স্ট্যান্ডারাইজড, মনও ঠিক তেমনি মানুষের স্টান্ডারাইজড মহানগরে। মানবিক, পারিবারিক, সামাজিক সমস্ত সম্পর্কের সাথে টাকার সম্পর্ক। বর্তমান সমাজ বিনিময়-মার্কেট, যেখানে টাকার বিনিময়ে সব কেনা যায়। সবই বিনিময়যোগ্য পণ্য, মানুষ পর্যন্ত। শুধু যে মানুষকেই কেনা যায় তা নয়, মানুষের মনও কেনা ওয়ান-টু’র ব্যাপার। মর্যাদা, খ্যাতি প্রতিপত্তি এসব সমাজের নিলামে ডাক দিয়ে উচ্চমূল্যে কেনার বস্তু মাত্র। নিলামের মাল। খেতাব উপাধি এসব বাহারি প্যাকেট বা মোড়ক, মাল বিক্রির জন্য। যত পঁচা মাল, তত তার বাহারি মোড়ক। মন যত বিবর্ন ও বিকৃত হতে থাকে নিত্যদিন তার তত লেভেল ও মোড়ক বদলায়।

২১/০৫/২০২০, ১১.১৫ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *