বিবিধ ফোর-প্লে (দ্বিতীয় পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  

আরো একবার মন খারাপ হয়েছিল হেলাল হাফিজের ওপর। একবার প্রেস ক্লাবে বসে তাকে অনুরোধ করেছিলাম আমার একটা কবিতার বইয়ের ভূমিকা লিখে দিতে। যেহেতু আমিই তাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি লিখেছি, প্রেস ক্লাবের পুরোনো প্রকোষ্ঠ থেকে বের করে পরপ্রজন্মের কাছে পুনর্বার তুলে ধরেছি; তাই সেই অপরিণত বয়সে ধারণা ছিল হেলাল হাফিজ আমার বইয়ের ভূমিকা লিখে দেবেনই। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি এক শব্দে ‘না’ বলেছিলেন। তার যুক্তি ছিল তিনি খুব অলস, পুরো বই পড়ে ভূমিকা লেখার মতো ধৈর্য তার নেই, আবার বই না পড়েই মিছেমিছি প্রশংসাও তিনি লিখতে পারবেন না এবং একজনকে লিখে দিলে অন্যরাও এসে জ্বালাতন করতে থাকবে তাদের বইয়ের ভূমিকা লিখে দিতে। শেষতক বলেছিলাম অন্তত দুই বাক্যের একটা শুভেচ্ছাবাণী লিখে দিতে, তিনি তাতেও রাজি হননি।

সেদিন তার ওপর ভীষণ রকম ক্ষুব্ধ হলেও এখন আমি বুঝি তিনিই ঠিক কাজটি করেছিলেন। এখন বুঝি— ইচ্ছের বিরুদ্ধে অন্যের বই পড়া কত বড় আজাব, বইয়ে অগ্রজের শুভেচ্ছাসনদ থাকা কতটা নিষ্প্রয়োজন এবং অন্যের সুপারিশবাণী ছাড়া কেবল নিজের কলমের জোরে লেখক হওয়াটা কত জরুরি। অতীতে বইয়ে নমস্য কবি নির্মলেন্দু গুণের ভূমিকা ব্যবহার করলেও ঐ ঘটনার পর আর কারো কাছে ভূমিকার জন্য যাইনি। হেলাল হাফিজের ওপর ক্ষোভের আরো কারণ আছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকালে তিনি ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ লিখে তরুণদের রক্ত গরম করেছেন, একাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে ‘মানবজন্মের নামে হবে কলঙ্ক হবে এ রকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই, উত্তরপুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হব আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ শুধু যদি নারীকে সাজাই’ লিখে তিনি প্রদীপ্ত পৌরুষের পসরা সাজিয়েছিলেন। সেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে কেবল নারীকেই সাজিয়েছেন; নারীকেই বাজিয়েছেন, মজিয়েছেন।

স্বৈরাচারবিরোধী উত্তাল গণআন্দোলন নিয়ে তার কবিতা নেই, যুদ্ধাপরাধী-বিরোধী গণজাগরণ নিয়েও তার কোনো ভাষ্য নেই। শাহবাগ থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে থাকলেও শাহবাগ তাকে স্পর্শ করেনি, দেশের কোনো সরকারি-বেসরকারি অনিয়ম তাকে বিচলিত করে না। ফেসবুকে অন্য সব কবি অনিয়মের বিরুদ্ধে কিছু-না-কিছু লিখলেও একমাত্র হেলাল হাফিজকেই দেখেছি বিবিধ বয়সী নারীদের বাহুলগ্ন হয়ে নিদ্রিত নারী-জাগরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে। এরও ব্যাখ্যা অবশ্য নিজে-নিজেই আবিষ্কার করেছি। হেলাল হাফিজ বহুবার বলেছেন— তার যা বলার ছিল, বলে ফেলেছেন; যা লেখার ছিল, লিখে ফেলেছেন; তার আর কিছু বলার বা লেখার নেই, বলে বা লিখে আর কাউকে তিনি ‘ডিস্টার্ব’ করতে চান না। এমন দশায় নিজেও প্রায়শ পতিত হই। কোনো-কোনো চলমান চাঞ্চল্যকর ইশুতে সবাই যখন বলে-লিখে ঝড় বইয়ে দেয় এবং সেই ইশুতে হাজারজন যখন আমার অবস্থান জানতে চায়, কোনো জবাব না দিয়ে তখন আমারও মাঝে-মাঝে ইচ্ছে করে পুরো পৃথিবীকে বিয়োগ করে কোনো সুগন্ধা-সুরেলা-সুনেত্রার বুকে নাক ডুবিয়ে সাঁই-সাঁই সাঁতার কাটতে, সুনিবিড় সবুজ উদ্যানে উদ্বাহু পদ্য পড়তে-পড়তে তার পরতে-পরতে প্রবেশ করতে।

[চলবে]

২২/০৭/২০২০, ১১.৫৮ PM

নোটঃ কবি আখতারুজ্জামান আজাদএর ফেসবুক ওয়াল হতে সংগৃহীত।

বিবিধ ফোর-প্লে (প্রথম পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *