বিশ্বজোড়া ফাঁদ আমার

  •  
  •  
  •  
  •  

সেসব কোনো এক সোনালী অতীতের কথা। তখন আমরা জানতাম ‘ট্যাবলেট’ হল এক ধরনের গোলাকার বস্তু যা শরীর- টরীর খারাপ হলে লোকে বাধ্য হয়ে গেলে, ‘ডিক’ হল গিয়ে টমের ছোটবেলার বন্ধু, কেউ ‘ফলো’ করছে মানেই সন্দেহজনক ব্যাপার আর ‘ফেস’ এর সাথে ‘বুক’ (মন্দ কথা ভাববেন না) মানে বইয়ের কোন সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ “ডোন্ট জাজ আ বই বাই ইটস্‌ কাভার”। তারপর নর্দমা দিয়ে প্রচুর মল বয়ে গেছে, ঢাকা তিলোত্তমা বা মিস্‌ বাংলাদেশ বা মিস্টার লন্ডন কিছুই হতে পারেনি কিন্তু আমাদের অভিধানে বিস্তর নতুন শব্দাবলী সংযোজিত হয়েছে। আর যেমন দাড়িদাদু বলে গেছেন বহু বছর আগে “বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি” আমরা হুবহু তেমনিভাবেই আন্তর্জালের ফাঁসে আট্‌কে পড়েছি।

বেরোনোর পথ নেই, আর বেরোলে বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে কারণ আমরা এখন ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজার ছবিও ফেসবুকে পোস্ট করি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কীভাবে সেল্‌ফি তুলতে হয় সে বিষয়ে বিশদ জানার জন্য দরকার পড়লে এমনকি ডক্টর লোধের সঙ্গেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে রাজি হয়ে যাবেন অনেকে। এমনই সংকটাপন্ন অবস্থা। তা কিছু ত আর করার নেই। জীবন মানে এখন আর জি-বাংলা নয়, জীবন হল ফেসবুক, ট্যুইটার এবং হোয়াটস্‌ অ্যাপময়। অস্বীকার করার উপায় নেই মশাই, জীবনের নানা ওঠাপড়া আপনার গায়ে লাগতে দিচ্ছেনা এই এরাই। এরা না থাকলে কিভাবে জানতে পারতেন যে জনতা কত্ত কিছু জানে। কেউ কারো চেয়ে কম যায়না। “তুই কুরোসাওয়া নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিস? জানিস আব্বাস কিয়ারোস্তামি আমাদের বাড়িতে এসে নিজে হাতে ইরানী চা বানিয়ে খাইয়েছে?” এবার যারা জানেনা তারা গুগ্‌ল করে মরুক আব্বাস মালটা অ্যাকচুয়ালি কে! শেফ্‌ না ছবি-করিয়ে নাকি চা বাগানের মালিক! এভাবে তো আমার-আপনার জ্ঞানভান্ডার-ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। হুঁ হুঁ বাওয়া, জীবনের ধন কিছুই যায়না ফ্যালা।

তবে এসব মোটামুটি সহ্যের মধ্যে। মানে আপনার পোষালে পড়ুন, না পোষালে ইলিশের সাইজ এ বছর ক্যানো ছোট বা ঠিক কী কী করলে এ বঙ্গে অচিরেই আবার লাল গোলাপ বিকশিত হবে সে ব্যাপারে অন্যদের সঙ্গে আপনার মূল্যবান মতামত শেয়ার করুন। কিন্তু আসল মুশকিল হল অন্য জায়গায়, সে বিপদের নাম ‘লাইক’। এই ‘লাইক’ যে কত-শত ন্যাংটো বেলার বন্ধুর বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে, কত যুবককে হি-ম্যান বা যুবতীকে ক্যাটরিনা এবং বেবোর ( বেবো জানেন না? ছ্যাঃ! গুগ্‌ল করুন) সংমিশ্রণে তৈরি এক উন্নততর মানুষীতে পরিণত করেছে তার হিসেব কে-ই বা রাখে। আপনি যত বেশি “লাইক” করবেন ততই আপনাকে লোকে লাইক করবে। ভয়ংকর এক ভিশাস সার্কেল। ধরুন আপনি আপনার ফেসবুকিয় বন্ধু্র ছবি ‘লাইক’ করলেন, সে করতেই পারেন কিন্তু নিয়ম হল শুধু আপনার বন্ধুর ছবি লাইকালেই চলবে না।

সে যদি তার পোষা কুকুরের উকুনের ছবি ‘ম্যাক্রো’ বলে পোস্ট করে সেটাও আপনাকে লাইকাতে হবে। তার মেজ শালার পিসিশাশুড়ির বাঁধানো দাঁতের ছবি দেখেও “হাউ নাইস, হোয়াট আ সাররিয়াল পিকচার!” বলতে হবে। পারলে ভালো না পারলে আপনার ‘আন্‌সোশ্যাল’ হওয়া আটকায় কে! এই ‘লাইকের’ চক্করে পড়ে কত কত চো… ইয়ে মানে মদ্‌না যে নিজেদের কেউকেটা ভেবে সুখে কালাতিপাত করিতে লাগিল তা আপনার ধারণারও অতীত। যাইহোক, এসব নিয়ে বেশি ভাবতে বসলে আবার ওদিকে হোয়াটস্‌ অ্যাপে এককাঁড়ি মেসেজ জমে যাবে। ট্যুইটারে ‘হাফ গার্লফ্রেন্ড’ এর আপডেট মিস হয়ে যাবে, অতএব সেই ধর্ম -ই ফলো করা যাক। নেট দুনিয়ার সকল ভাল, আমিও ভাল, তুমিও ভাল। ভাল থাকবেন সব্বাই। সবিশেষ নিবেদন এই যে, এসব লিখলাম বলে আবার যেন ভুলেও ভেবে বসবেন না আমি ‘লাইক’, ‘ফলো’ ইত্যাদি ব্যাপার অপছন্দ করি। খুব-ই মানে…… হেঁ হেঁ… বুঝলেন কিনা।

১৬/০৭/২০২০, ১০.০২ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *