বিয়ে

  •  
  •  
  •  
  •  

আমার যেদিন রাতে বিয়ে হয়, সেদিন মুষলধারে বৃষ্টি। পরের দিন ভোররাত থেকে বৃষ্টি একটু একটু ধরতে ধরতে দুপুরের দিকে একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। বাড়ির নিমন্ত্রিতরা যখন বেলা করে ভাত খেয়ে এঁটো মুখ আঁচাচ্ছে কলতলায় আর আমি নতুন তাঁতের শাড়ি সামলে আমার সদ্য স্বামীর হাতে জলের গ্লাস তুলে দিচ্ছি, দেখলাম উঠোনের একপাশে এক খুনখুনে বুড়ি বসে আছে। মাথায় সাদা ফ্যাঁসফ্যাঁসে চুল, গায়ের চামড়াগুলো শুকিয়ে কেমন গুটলি পাকিয়ে গেছে। বুড়ো মানুষ দেখলে আমার দয়া হয়, তবে একে দেখে কেমন যেন বুকটা ধক করে উঠল। স্বামীকে আড়ালে জিজ্ঞেস করলাম,
– “উঠোনে একজন বসে আছে, উনি কেউ হন তোমাদের?”
স্বামী বললেন,
– “কই? উঠোনে আবার কে?”
– “একজন খুব বয়স্ক মহিলা দেখলে না?”
– “কি জানি। লক্ষ্য করি নি। আমাদের বাড়িতে তো সেরকম বয়স্ক বলতে ছোটঠাকুমা। ঐ যিনি আশীর্বাদের সময় তোমার হাতে বাউটি পরালেন।”
– “না উনি নন, ওনাকে আমি চিনি।”
পরে বাড়ির নানা কাজে বুড়ির কথা চাপা পড়ে গেল। তবে পরদিন সকালেও আমার শোবার ঘরের জানলা থেকে দেখলাম বুড়ি এখনো উঠোনে বসে আছে। আমি দেখে আমার স্বামীকে তাড়াতাড়ি ডেকে তুললাম। উনি দেখলেন তবে এবার গা করলেন না। সকালে ওনার অফিস যাওয়ার তাড়া থাকে। এই বলে উনি স্নানে চলে গেলেন। উনি অফিসে বেরিয়ে যাবার পরও টুকিটাকি হাতের কাজ সেরে এসে দেখি বুড়ি এখনো বসে। মাঝে মাঝে আমার জানলার দিকে দেখছে। আমি এবার জানলাটা বন্ধ রাখার স্থির করলাম। তাও জানিনা কেন মনটা আনছান করতে থাকল সারাদিন। এরমধ্যে শাশুড়িমা দুবার এলেন, একবার খেতে ডাকার জন্য আর একবার আমার স্বামীর জামাকাপড় ইস্ত্রি করে তুলে রাখার জন্য। দ্বিতীয়বার এসে আমার মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
– “কী ভাবছ বলতো এত?”
আমি কিছুনা বলে এড়িয়ে গেলাম।

সন্ধ্যার মুখে স্বামী ফিরলে আমি ওনার চা-জলখাবারের ব্যবস্থা করতে লাগলাম রান্নাঘরে এসে। হঠাৎ দেখি দরজার কাছে আমার স্বামী দাঁড়িয়ে। আমি তাকাতেই উনি গলা নামিয়ে বললেন,
– “শোনো, বড়দের সামনে একটু ঘোমটা দিয়ে রাখো। শাড়িটা এরকম কোমরে গুঁজেছো কেন?”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
– “এ বাড়িতে আছেই বা কে? আত্মীয়রা তো সবাই সকালেই চলে গেছে। থাকার মধ্যে তো শুধু মা আর তোমার ভাই।”
– “না, ঐ বুড়িটা কি ভাববে বলতো?”
– “কোন বুড়ি?”
– “ঐ যে বসে আছে দেখো নি?”
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বুড়িটা কে এমন যার ভাবা না ভাবায় কিছু এল গেল? বড় অদ্ভুত ব্যাপার তো! আমি স্বামীর পাশ কাটিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোতেই শাশুড়িমার সামনে পড়লাম। উনিও বললেন,
– “বৌমা, মাথায় কাপড়টা দাও। আমাদের আর কি। বুড়িটা দেখলে কি বলবে বলো?”
আমি দেখলাম সামান্য ঘোমটার জন্য প্রথম দিনেই এত তর্কে গিয়ে লাভ নেই। হাতে থাকা খাবারের প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে কোমরে গোঁজা আঁচলটা মাথায় তুলে দিলাম।

গত কয়েক মাসে অনেককিছু বদলেছে। বুড়িটা উঠোন থেকে নড়েই না। এখন অনেকটা সয়ে গেছে অবশ্য। আগের মত বিরক্ত লাগে না আমার । শাশুড়িমা মাঝে সাঝে দেখি দাঁড়িয়ে গল্প করেন। যাকগে। এখন আমি দুমাসের অন্ত্বসত্তা। এরমধ্যে আমার সাধের স্কুলের চাকরিটায় ইতি টানতে হয়েছে। স্বামী শাশুড়ি দুজনেই একসুরে বলেছিলেন,
– “আমাদের অসুবিধা নেই ভূমি। কিন্তু বুড়িটা কি ভাল চোখে দেখবে? তুমিই বলো।”
মাথাটা সত্যিই খুব গরম হয়েছিল সেদিন। শোবার ঘরে এসে স্বামীকে বললাম,
– “কোথাকার এক উটকো বুড়ি , সে কি ভাববে বলে চাকরি ছাড়তে হবে? এটা কি ধরনের আবদার?”
স্বামী কিছু বললেন না। তাতে আরো রাগ হল। পরদিন সকালে মাকে ফোন করে সবটা বললাম। মা আমাকে আরো আশ্চর্য করল। বলল,
– “এসব একটু মানিয়ে নে মা। বুড়িটা যদি সত্যিই কিছু মনে করে তা কি ভাল দেখাবে?”
– “মা! বুড়িটাকে তুমি চেনো? যে ওর হয়ে শালিশি করছো?”
– “না চিনি না। তবে তোর শাশুড়িমা যা বলছেন কর। সংসারটা তো উনিই ভাল বোঝেন। ”

এভাবেই চলছিল। মানে চালিয়ে নিচ্ছিলাম আর কি। উঠোনের পাশটায় বুড়িটাকে দেখলে আমার গা পিত্তি জ্বলে যায়। শাশুড়িমা বুঝতে পারেন। কিছু বলেন না। কেন জানি মাঝে মাঝে মনে হয় উনিও অসহায়। বুড়ি কোনো শক্তি দিয়ে ওনাকে ভয় দেখিয়ে রেখেছেন। একদিন দুপুরে খেয়ে উঠে একটা উলের ছোট মোজা বোনার চেষ্টা করছি, শাশুড়িমা ঘরে ঢুকলেন,
– “আমার কিন্তু মনে হচ্ছে গোপাল আসবে, কি বল বৌমা?”
আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম,
– “কিভাবে বলি মা? আমার এসবের ধারণা আছে নাকি?”
– “তাও বটে। তবে প্রথম তো, ছেলে হলেই ভাল। দেখো আমার তো বংশে যেই আসুক, তাকেই আদরে মাথায় করে রাখবো। কিন্তু বুড়িটা তো সেকেলে। বোঝোই তো, ছেলের মুখ দেখবে বলেই–”
আমি চুপ করে থাকলাম। আজকাল এসবের প্রতিবাদ করে মেজাজ খারাপ করি না। মা বলে শান্ত থাকবি এই সময়টায়। শান্ত আমি কখনো ছিলাম না ছোট থেকেই। বরঞ্চ বড় ডানপিটে, গেছো ছিলাম। ইস্কুলে আবৃত্তি করতাম খুব। বিয়ের পরে পরে আমার স্বামী মাঝেমধ্যে আমার জন্য বকুলফুল নিয়ে আসতেন। আর আমি সন্ধেবেলা লোডশেডিং হলে একেকদিন ছাদের কার্নিশের কাছটায় গিয়ে অতুলপ্রসাদী গান গুনগুন করতাম। বুড়িটা কী ভাববে, বুড়িটা কী ভাববে করে এক এক করে সব গেলো আমার। আজকাল নিজের ভেতরেই গুমরে থাকি। বয়সটাও যেন হঠাৎই বেড়ে গেছে। এতগুলো বছর কেটে গেল এ বাড়িতে, বুড়িটা শনি হয়ে জেঁকে বসে রইল উঠোনের কোনটায়। আমার কোল আলো করে যে কন্যা সন্তানটি এসেছিল, তার বয়স আজ উনিশ। উঠতি বয়স, সব কথা ওকে শোনানো যায় না তেমন। আমিও আজকাল ওর ঠাকুমার মতই বুড়ির দোহাই দিই। বারণ করি অনেককিছু। কাজ হয় না। আর বাবা-মেয়ের তো আদায় কাঁচকলায়।

সে যাই হোক, এইভাবে একদিন দেখলাম শ্রাবণ মাসের শেষের দিকে বৃষ্টি আর ধরেই না। সেই আমার বিয়ের দিন যেমন মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছিল, এই দিনটাও সেরকমই একদিন। উঠোনের জায়গায়, জায়গায় কাদা জমে আছে। আমার মেয়ে একসময় আমায় এসে বলল,
– “মা দেখো, বুড়ি বসে জলে ভিজছে। তাও উঠবে না। কি যে পায়!”
হায়! আমি যদি তা জানতাম। মেয়ের কথা শেষ হতে না হতেই উঠোনে দড়াম করে একটা আওয়াজ! মেয়েকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখলাম উঠোনের পাঁকে আমার স্বামী বুকে হাত দিয়ে পড়ে আছেন। ওনাকে আমি কখনো দুর্বল দেখিনি। তাই মেয়ে স্থির থাকলেও ঐ অবস্থায় মানুষটাকে দেখে আমি হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। যখন তাড়াহুড়ো করে দুজনে মিলে আমরা আমার স্বামীকে কাদা থেকে তোলার চেষ্টা করছি, স্পষ্ট দেখলাম উঠোনের কোণে বুড়িটা কি একটা চিবোচ্ছে আর হাসছে। দেখে আমি প্রচন্ড রেগে উঠতে গেলাম। পরক্ষণেই আমার স্বামী আমার হাত ধরে থামালেন। আর সেই বিয়ের পরে পরে যেভাবে উনি আমার হাতে বকুল ফুল দিয়ে আমার গালে হাত রাখতেন, ঠিক সেইভাবে আমার গালটা ছুঁলেন। কাতর স্বরে বললেন,
– “ভূমি রেগে যেও না। রেগে কি লাভ? ওর নাম সমাজ। ওর কাজই তো মানুষ কাদায় পড়লে তার মজা দেখা।”

১৬/১০/২০২০, ১১.৫৯ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *