মঈননগর আবাসিক প্রকল্প

  •  
  •  
  •  
  •  

প্রেস কনফারেন্স চলছে। বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের সামনে হাসিমুখে বসে আছেন মঈন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। এককালে কোথায় যেন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করতেন, সম্প্রতি নাসার কিছু প্রজেক্ট লটারিতে জিতে চাঁদে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করেছেন। জনাব মঈন,” দৈনিক ঠুকে মারি পত্রিকার সাংবাদিক ফুয়াদ মহাজন উঠে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে নিয়ে গর্জে ওঠেন,
– “আমরা সবাই জানি এইসব চাঁদে হাউজিং ব্যবসা সম্ভব নয়! কিন্তু আপনি বাংলা ব্লগের মাধ্যমে সারা দুনিয়া জুড়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে বেড়াচ্ছেন, আপনি চাঁদে মঈননগর নামে এক আবাসিক প্রকল্প গড়ে তুলতে যাচ্ছেন! আমরা তো একে এক প্রকৌশলীর আজগুবি চিন্তা হিসেবেই দেখছি। আপনি কি দয়া করে ব্যাখ্যা করবেন, আপনি কিভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করবেন?”
মঈন মৃদু হাসেন। অনেক কষ্টে তাঁকে এই মৃদু হাসি ম্যানেজ করতে হয়। হাসতে গেলেই সাধারণত তাঁর দুই পাটি দাঁতই বেরিয়ে পড়ে, সেগুলোকে বুঁজিয়ে রেখে হাসার ব্যাপারটা তাঁকে শিক্ষা করতে হয়েছে আয়নার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে।
– “পারি বইকি জনাব!”
দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন তিনি।
– “মঈননগর এখন আর অসম্ভব কিছু নয়, সত্যি। শিগগীরই আপনারা চাঁদের বুকে ঘরবাড়ি তুলে পুত্র পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে ঘর করতে পারবেন। চাঁদে বড় বড় দালান তুলবেন, বাড়ির সামনে ফুলের গাছ আর পিছনে পুঁইশাকের গাছ লাগাবেন, বিকালে চাঁদের গর্তগুলোতে বেড়াতে যেতে পারবেন। আর মাত্র কয়েকটা বছর!”

ফুয়াদ মহাজন ক্রুর হাসেন।
– “হাসালেন জনাব মঈন! ভুলে যাবেন না, আমিও ইস্কুলে দুইপাতা বিজ্ঞান পড়েছি! চাঁদে বাতাস নেই, পানি নেই, ওখানে কিভাবে মানুষ বাস করবে? চাষ করা তো দূরের কথা!”
মঈন করুণার হাসি হাসেন। মনে মনে অবশ্য একটু শঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি, সাংবাদিকগুলো আজকাল অ্যাতো লেখাপড়া করে কেন?
– “এ কথা ঠিক যে চাঁদে বাতাস নেই।” মঈন হাসেন। “কিন্তু বাতাস দেয়া হবে। পানি নেই চাঁদে, সত্যি কথা। কিন্তু পানিও দেয়া হবে।”
– ফুয়াদ মহাজন ঠা ঠা করে হাসেন। “কিভাবে দেবেন? পৃথিবী থেকে ফুঁ দিয়ে তো বাতাস পাঠাতে পারবেন না। দুই টাঙ্কি পানি পাঠিয়েও কুলাতে পারবেন না! তবে?”
উপস্থিত জনতার মুখে এই প্রশ্নটাই খেলা করে। মঈন হাসেন মুহুহুহু করে।
– “জনাব ফুয়াদ, আপনি দু’পাতা পড়েই বিজ্ঞানে ইস্তফা দিয়ে দিয়েছেন। কষ্ট করে আরো একটা পাতা উলটালেই আপনি বুঝতে পারতেন, ফুঁ দিয়ে বা টাঙ্কি দিয়ে নয়, চাঁদে এসব জল বায়ুর ব্যবস্থা আমি করবো অন্যভাবে! কইয়ের তেলে কই ভেজে!”
ফুয়াদ মহাজন উদ্ধত স্বরে বলেন,
– “কিভাবে?”
মঈন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেন।
– “সোজা! চাঁদে প্রচুর বাতাস এখনই মজুদ আছে, কিন্তু শক্ত অবস্থায়! একেবারে জমাট বেঁধে টাইট হয়ে, মানে টাইটেনাস অক্সাইড হয়ে আছে সেই বাতাস। আমি চাঁদে একটা বিরাট ধামাকা ফাটানোর ব্যবস্থা করছি, যাতে এই বন্দী অক্সিজেন মুক্ত হয়ে চাঁদে একটা ছোটমাপের বায়ুমন্ডল তৈরি করে ফ্যালে! আর পানিও আসবে একই কায়দায়! চাঁদে প্রচুর বরফ আছে, আপনারা সম্ভবত জানেন। ঐ বরফই সেঁকে গলিয়ে পানি বার করা হবে। সেই পানি আমার মঈননগরের লোকজন খাবে, গোসল করবে, পুঁইশাকের গোড়ায় দেবে। বুঝতে পাল্লেন তো? জলবত্তরলম যাকে বলে!”

চাঁদে যে অ্যাতো বাতাস ছিলো, ফুয়াদ মহাজন জানতেন না, তিনি থতমত খেয়ে একটু চুপ করে যান। কিন্তু চুপ করে থাকার বান্দা তিনি নন, মূহুর্তেই ডুকরে ওঠেন,
– “কিন্তু এই ধামাকা আপনি ফাটাবেন কিভাবে, য়্যাঁ?”
মঈন ভুরু নাচিয়ে হাসেন।
– “কিছু আত্মঘাতী বোমারুর সাথে আমার চুক্তি হয়েছে, তারা আপাতত নাসায় ট্রেনিং নিচ্ছে, আগামী মাসেই রকেটে চেপে চাঁদে গিয়ে ধামাধাম ফাটানো শুরু করবে!”
সবাই শিউরে ওঠে মঈনের ভূমিহারী কূটচালের নমুনা দেখে। এমন সময় বাইরে একটা শোরগোল ওঠে, সাংবাদিকদের কয়েকজন উঁকি মেরে দেখেন, অনেক লোক সেখানে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে, তারা প্রেস ক্লাব ঘেরাও করেছে। কারো প্ল্যাকার্ডে লেখা, মঈননগর বাতিল করো’, কারো পোস্টারে লেখা, চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা চাঁদের চেয়েও জ্যোতি, কারো ব্যানারে লেখা, বিকিরণের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা বানাও! ইত্যাদি ইত্যাদি। সবাই এবার ছেঁকে ধরে মঈনকে,
– “এ ব্যাপারে আপনার কী প্রতিক্রিয়া?”
মঈন খিলখিল করে হাসেন।
– “ভাইসব, আমি প্রতিক্রিয়া কিভাবে ব্যক্ত করবো? আমি তো এখন অসুস্থ, এই দেখুন।”
এই বলে তিনি শার্ট খুলে কোমরে পড়া একটা কোমরবন্ধ দ্যাখান সবাইকে, ছিইছি এমেপাজিজের ঢঙে। সাংবাদিকরা চুপ করে যায়, মঈন চেয়ার ছেড়ে উঠে শিস দিতে দিতে বেরিয়ে যান।

০১/১০/২০২০, ০৯.৪৮ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *