মোহভঙ্গের মহাযজ্ঞ

  •  
  •  
  •  
  •  

একদিন আমাকে একজন ইনবক্সে জানতে চাইলেন,
– আচ্ছা… ভালো মানুষ, মন্দ মানুষ কিংবা শুধু মানুষ চেনার কি কোন উপায় আছে?
তার সেই প্রশ্নের পরে এমন অনেক দীর্ঘ রজনী পার হয়ে গেছে কিন্তু তাকে কি বলবো আর তার প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর কি হতে পারে তা ভেবে ভেবে কেটে গেছে আরো বহু বিনীদ্র রজনী। সেই আদি যুগ থেকে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করেও আজ মানুষ শুধু মানুষই চেনার চেষ্টা করে গেলো। কিন্তু মানুষ চেনা হলো না। আর তাছাড়া তার এই প্রশ্নের জবাব এক কথায় কিংবা অতি সংক্ষিপ্ত আকারে বলা একেবারেই অসম্ভব। সিগারেটখোর যেমন এক টান দিয়ে ধোঁয়া অর্ধেক গলায় রেখেই বলে দিতে পারবে, এটি ড্যাম সিগারেট ছিল। তারা’খোর আকাশের দিকে তাকিয়েই বলে দিতে পারবে, এই তারাটি কয়েকশো বছর পর মারা যাবে। দীর্ঘদিন তামাক খেলে সিগারেট চেনা যায়। আকাশের দিকে তাকালে নক্ষত্র চেনা যায়; কিন্তু হায়, ত্রিশ বছর মার্বেল আকৃতির দুটি চোখের দিকে তাকাবার পরও মানুষটাকে চেনা যায় না।

যে মানুষটি তোমাকে রেখে চলে গেছে তুমি তার যে কোন একটি ছবি বের করো। কয়েক মিনিট তার চোখের দিকে তাকালে দেখবে কেমন মায়া মায়া লাগছে। আই কন্টাক্টের একটা বিশেষত্ব হল, এক দৃষ্টিতে তাকালে তার চোখের মনির সুরঙ্গপথ দিয়ে তুমি তার অন্তরে চলে যেতে পারবে। ছবিটির দিকে তুমি বেশি সময় তাকিয়ে থাকতে পারবে না কেননা অভিমানি শান্ত স্নিগ্ধ সমরেশের নায়িকার মত টান টান খুব চেনা এই চোখ দুটি – একদিন আষাঢ়ের রাতে চোখ রাঙ্গিয়ে ফেলেছে। কাছের মানুষটির চলে যাওয়ার ঘটনা এক সময় সহনীয় হয়। কেউ চলে গেছে এটিকে তুমি একদিন নিয়তি ভেবে সান্ত্বনা খুঁজে পাবে। তবে কেউ চোখ রাঙ্গিয়ে ফেলেছে, এই ব্যাপারটি তোমাকে প্রায় রাতে দুঃখ দেবে। হৃদপিণ্ডে ধুপ ধুপ করে শব্দ হবে; যেন কেউ কাঠের জুতা পায়ে দিয়ে তোমার বুকের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

পানি চক্রের মত এই সব আবেগের একটা ইমোশন চক্র আছে। প্রথমদিকে খুব দুঃখ হবে। বাংলা মদ- গাঁজা সিগারেট – স্যাড গান – মেয়েদের ক্ষেত্রে বালিশ মুখে চেপে ধরে ঠোঁট কামড়িয়ে কাঁদা। প্রথমদিকে তাকে অন্য কারো সাথে দেখলে অনেকেই প্যাথলজিক্যাল জেলাসিতে আক্রান্ত হয়। তাকে বলা ঠিক একই কথা গুলোই এখন রাতে অন্য কাউকে বলছে এসব মনে করে তোমার বুকের শব্দ বেড়ে যাবে। শুধু তুমিই বুঝবে কী কষ্টের ভেতরে তুমি আছো, আর কেউ না। তারপর সব একদিন সহনীয় হবে। কেউ আসবে সান্ত্বনার কথা শোনাতে। কেউ আসবে বিরক্তি দেখাতে, কেউ আসবে তোমাকে উদ্ধার করতে। একদম ইমারজেন্সি রোগীর মত কোলে নিয়ে দৌড়াবে, একদম ডুবন্ত মানুষের মত লাইফ জ্যাকেট নিয়ে সাঁতরাবে। আবার হয়ত থেমে যাবে। আমরা আসলে মানুষের কাছে হারি না, আমরা হারি আমাদের ইমোশনের কাছে। ফালতু বানোয়াট কথা শুনে রাতে ডিম লাইট জ্বালিয়ে স্বপ্ন দেখি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমরা ৭০ ভাগ সময় ভুল মানুষকে ভালোবাসি। ভুল মানুষকে ঠিক মনে করি।

আচ্ছা, মনোবিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে মানুষ চেনার কোন উপায় কী আছে? মনোবিজ্ঞানে মানুষ চেনার ব্যপারে কিছু বিষয় তো অবশ্যই আছে। লক্ষ্য রাখবে মানুষটি কতবার ‘আমি’ শব্দটি ব্যবহার করছে। একটি গবেষণায় দেখে গেছে সাধারণত হাসপাতালের মানসিক রোগী প্রতি ১২ টি শব্দে একবার ‘আমি’ উচ্চারণ করে আর একজন স্বার্থপর মানুষ প্রতি ১৫ টি শব্দে একবার। এরকম কিছু শব্দের উপর নির্ভর করে এক সময় মানুষের রুচিবোধ স্পষ্ট হয়ে উঠে। ‘ফিগার আউট পিপল ফ্রম দেয়ার ওয়ার্ডস ‘ বইটিতে বলা হয়েছে কিভাবে একটি অচেনা মানুষের সাথে কিছু সময় কথা বলেই একটা বেসিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। কথা বলার সময়কার মধ্যবর্তী বিরতি, শব্দ ভঙ্গি, শব্দ নির্বাচন, তার চোখের আই কন্টাক্ট এই কটি জিনিস বোঝার চেষ্টা করবে। কিছুদিন আগে জন কর্ডের লেখা পড়ছিলাম, তিনি জানিয়েছেন তিনি কারো সাথে কথা হলেই সরাসরি কোন প্রশ্ন না করেই বলে দিত পারতেন – ‘ফ্রাঙ্ক বিয়ে করতে চায়’ অথবা ‘তরুণী মিসেস জেনি বোধহয় অন্তঃস্বত্বা’। তিনি মাইন্ড রিডার ছিলেন না। তিনি সাধারণ একটি কৌশল চর্চা করেছেন – এটিকে বলে “কন্টেন্ট এনালাইসিস”। সময় পেলে কখনো এই “কন্টেন্ট এনালাইসিস” নিয়ে লিখব। আজ এই পর্যন্তই। সবাইকে রামাদান কারিম মুবারাক। ধন্যবাদ। শুভ রাত্রী।

২৪/০৪/২০২০, ১১.২৯ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *