শেষ বিকেলের মেয়ে (চতুর্থ পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  

তারপর ইন্টারমিডিয়েট এক্সামের আগে আমার টাইফয়েড হলো। পড়াশোনা মাথায় উঠল। একটা পরীক্ষা দেই নি। বাদবাকিগুলো খারাপ দিলাম। রেজাল্ট বেরুনর আগ থেকেই জানি ফেল। কী মজা! আহা! আর মা শুরু করলেন তোড়জোড়। মেয়ের বয়স হয়েছে বিয়ের জন্য পাত্র দেখো। ইন্টার ফেল মেয়ে কী ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার পাত্র পাবে? বাবা মুসিবতে পড়লেন। মায়ের সামনে বাবা মুখ ফুটে খুব বেশি কিছু বলতে পারেন না। ভাইয়া শহরে গিয়ে প্রেম করে বিয়ে করে ফেলেছে , আমিও যদি ভবিষ্যতে তাই করি, ইত্যাদি ইত্যাদি। অতএব বিয়ের পাত্র দেখা শুরু। অপু তখন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে। রেজাল্ট যেদিন দিল, বাসায় এলো। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষের পর হতেই ঘরের বাহিরে পা দেইনি। কতদিন পর দেখা।
– কীরে এত মোটা হয়ে গেলি কেন?
– বিয়ে হবে এই আনন্দে।

আমার জবাব শুনে তার সে কী দাঁত বের করে হাসি। আমার চোখ ফেটে জল আসছিল। আমি পাথরের মত মুখ করে দাঁড়িয়েই রলাম। ইন্টারমিডিয়েট ফেল আমার সাহস হলো না হবু ডাক্তার হতে যাওয়া অপুকে বলি,
– আমাকে তোর সাথে নিয়ে যা প্লিজ। প্লিজ অপু। আমাকে রেখে চলে যাস না, আমার খুব ভয় হচ্ছে।
কী হতো যদি সেই যে সেদিন যখন ওকে জড়িয়ে ধরলাম তখন যদি বলে দিতাম ওর জন্য সকাল সন্ধ্যে কত কী গান বুনি আমি? আর এখন? এখন বললে ও হয়ত ভাববে ও ভাল জায়গায় সুযোগ পেয়েছে তাই নিজেকে গছিয়ে দিতে চাইছি। আচ্ছা যদি আমি সত্যিই ওকে বলে বসতাম,
– আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না। তোর সাথে আমাকে নিয়ে চল। যেখানে ইচ্ছে সেখানে। আমার খুব সাধ তোর অপর্ণা হওয়ার।
যদি বলে দিতাম? রফিক নামের এই সাদাসিধে ছেলেটা জানলই না ওকে যে আমি মনে মনে সারাদিন অপু বলে ডাকতাম।

চোখের নিচে কালশিটে। গত রাতে রাব্বি আমাকে অনেক মারধোর করেছে। হাত নাড়তে পারছি না। মনে হয় ভেঙে গেছে। রাব্বির অফিসে কী জানি ঝামেলা চলছে। ঠিকাদারী সংক্রান্ত কাজকারবার ওদের। আমি কী আর অত বুঝি। শুধু বলতে গিয়েছিলাম এত রাত করে বাসায় ফিরলে কেন? রেগে গেল। ওর গায়ে মদের গন্ধ। সাথে মেয়েমানুষেরও। আমি বুঝি ঠিকই। বলি না কিছুই। কেন বলিনা সেটাও খুঁজে বের করেছি। এই মানুষটা আমার স্বামী। কিন্তু সে কখনো আমার ভালবাসা পাওয়ার মত কিছুই করেনি। বন্ধুর মত মেশেনি। আমি গান গাইতাম যেই হারমেনিয়ামটা দিয়ে সেটা বেঁচে দিয়েছে। ছবি আঁকতাম। বলল,
– ওসব কবীরা গুনাহ।
জোর করে বোরখা পরাল। শাড়ি পরে একদিন বাবার বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম বলল,
– মানুষজনকে পেট দেখিয়ে দেখিয়ে বাবার বাড়ি যাবা, আমাকে দোযখে নিয়ে যাওয়ার জন্য?
কী বিশ্রি একটা কথা। বজ্রাহতের মত দাঁড়িয়ে রলাম। অথচ আমি তখন যত্ন করে শাড়ি পরতে শিখেছি। কোয়ার্টার হাত ব্লাউজ। সব দিক ঢেকে ঢুকে নিপাট করে শাড়ি পরেছি। মাথায় ঘোমটা। রাতে না খেয়ে ছিলাম। মানুষটাতো আমাকে ভালবাসে না। আমিও আশা করিনি কেউ এসে জড়িয়ে ধরে বলবে,
– বউ খেয়ে নাও। ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না। সরি।
ক্ষুধার্ত আমাকে দিয়ে মানুষটা বরং তার অন্য খিদে মিটিয়ে নিল। আমি শুধু নীরবে চোখের জল ফেললাম। আর তাকে ঘৃণা করতে শুরু করলাম। আর অভিমান। কার উপর কে জানে? বাবা মা? নাকি অন্য কেউ?

[চলবে]

১০/০৩/২০১৯, ১০.০০ PM

শেষ বিকেলের মেয়ে (প্রথম পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (দ্বিতীয় পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (তৃতীয় পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (পঞ্চম পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (ষষ্ঠ পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (সপ্তম পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (শেষ পর্ব)

1 thought on “শেষ বিকেলের মেয়ে (চতুর্থ পর্ব)”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *