শেষ বিকেলের মেয়ে (প্রথম পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  

টাইটানিকের গানটা বাজছে। রুমে আমি একাই থাকি। ইদানীং বেশ কয়েকটা মাকড়শা দম্পতি আমার প্রতিবেশি হিসেবে বসবাস করছে, পশ্চিমের দেয়ালটায় তাদের সুখের সংসার। টিকটিকি ঘুরছিল টেবিলের উপর। মাছি উড়ছে। খোলা নাস্তার প্লেট। আমি অপুকে ভাবি। একা হলেই ওকে ভাবতে আমার বেশ ভাল লাগে। অপু ওর নাম নয়। আমি ওকে অপু ডাকি। কৈশরে আমার একদিন ভারি অপর্ণা হওয়ার সাধ হয়েছিল বিভূতির পথের পাঁচালি পড়ে । ওর আসল নাম রফিক। আমাদের ভাড়াটে হিসেবে থাকত ওরা। আমরা এক কলেজে পড়তাম। ইন্টারমিডিয়েট সাড়ম্বরে ফেল করার পর পরই আমার বিয়ে হয়ে গেল। আর অপু বোর্ড স্ট্যান্ড করে এলাহী এক কান্ড বাঁধিয়ে দিল ছোট্ট মফস্বল শহরটায়। তারপর সে ডাক্তারী পড়তে শহরে চলে গেল।

বছর দুয়েকের মাথায় তার সে কি বদল। একদম বদলে গেল ছেলেটা। এইতো সেদিনও একসাথে মধু স্যারের বাসা থেকে ফিরছিলাম। স্যারের ফিস, কলেজের বেতন দিতে পারছিলনা। আমি আমার জন্মদিনে পাওয়া সোনার নথটা একদিন বেঁচে দিলাম। বাবা উপহার দিয়েছিলেন। মিথ্যে করে বলেছিলাম হারিয়ে গেছে। অপু নিতে চাইছিলনা। জোর করে ওর বুক পকেটে টাকাটা যখন গুজে দিলাম ওইযে কবি সাহিত্যিকরা কী যেন বলে হার্টের বিট মিস হওয়া আমার হলো ঠিক তাই। অপু বুঝেছিল কিনা জানা নেই। তবে তার ম্লান মুখে এক চিলতে হাসি ছিল। আমার ফুচকা খেতে ভাল লাগত। রোজ ফেরার পথে তারিয়ে তারিয়ে ফুচকা খেতাম। ওর আবার এসিডিটির সমস্যা ছিল। মিছেমিছে ব্যাগে এন্টাসিড রাখতাম আর গ্যাস্ট্রিকের ঔষুধ। বলতাম আমার আলসার আছে তাই রাখা। অপু বুঝত কিনা জানা নেই ঔষুধগুলো যে আমি ওর জন্যই বয়ে বেড়াতাম সারাক্ষন। লোকে ওকে খেপাত, স্বর্ণার দারোয়ান, বডিগার্ড এসব বলে বলে। অপু শুনে বিরক্ত হতো।

আমি গাধা ছিলাম। অংক মাথায় ঢুকত না। ক্লাস শেষে আমাকে জ্যামিতির জটিল উপপাদ্যগুলো বোঝাতে বোঝাতে হাল ছেড়ে দিয়ে অপু মাথার চুল ছিঁড়ত। আচ্ছা সে যে এত জটিল সব ক্যালকুলাস জিওমেট্রি ফিজিকস বুঝত আমাকে কখনো বুঝল না কেন? মাঝে মাঝে রেগে গেলে ও আমার বেনী করা চুলে হেচকা টান মারত। চুল খুলে দিত। আমার চুলে কেউ হাত দিলে আমি রেগে যাই ভীষণ। এটা সে জানত দেখেই অমন করত। রাগ করে একদিন চুল কেটে ছেলেদের মত করে ফেললাম। অপু মন খারাপ করেছিল সেদিন। বারবার আমার চুলের দিকে তাকাচ্ছিল। ভাল হয়েছে। যখন তখন চুল খুলে দেওয়ার নির্মম শাস্তি। বাসায় বাবা মা অপুকে বড্ডো স্নেহ করতেন। করবেন ইতো। সব সাবজেক্টে হায়েস্ট মার্ক। এলাকার ছোট ছেলেরা ওর কাছে ম্যাথ আর ইংলিশ পড়তে আসে। নাইন টেন রা ফিজিকস কেমিস্ট্রি বুঝতে আসে। কত ডাক নাম অপুর। ছেলেমেয়েরা দেখা হলেই পথে ঘাটে ওকে শুধু সালাম দিত। আমি হাসাহাসি করতাম। স্যার স্যার ডেকে খেপাতাম।

[চলবে]

২৯/০১/২০১৯, ১১.০৬ PM

শেষ বিকেলের মেয়ে (দ্বিতীয় পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (তৃতীয় পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (চতুর্থ পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (পঞ্চম পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (ষষ্ঠ পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (সপ্তম পর্ব)

শেষ বিকেলের মেয়ে (শেষ পর্ব)

1 thought on “শেষ বিকেলের মেয়ে (প্রথম পর্ব)”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *