শ্বাশুড়ি সমাচার

  • 1
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

আমার শ্বাশুড়িকে কে যেন ফোনে “I Love you” বলেছে! একবার নয় বেশ কয়েকবার। ফোন রিসিভ করলেই বলে,
– “স্যরি জান, আইলাভিউ”।
বদমাশ লোকটা ফোনে মহা উৎপাত শুরু করেছে। অন্য কোন কথা বলে না, শুধু বলে,
– “স্যরি জান আইলাভিউ”।
আমার শ্বশুর এখনো ঘটনা জানেনা। জানলে কি হবে ভাবতেই ভাল লাগছে! আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ির প্রেমের বিয়ে। কলেজের ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন আমার শ্বাশুড়ি। আশপাশের অনেকেই পছন্দ করতেন তাঁকে । কিন্তু আমার চতুর শ্বশুরমশাই ভাজুং ভুজুং দিয়ে তাকে বিয়ে করে ফেলেন। এবং কোন প্রকার বিরতি ছাড়াই চার চারটি ছেলেমেয়ে নিয়ে পারিবারিক বন্ধনকে নিরাপত্তার চাদরে আবদ্ধ করেছেন। আমার কিশোরী শ্বাশুড়ীর অনেক গুলো প্রেমিকের মধ্যে একজন ছিলেন সনাতনী হারাধন বোস। বেচারা হারাধন আমার শ্বাশুড়িকে না পেয়ে এখন সন্নাস জীবন যাপন করছে। জাবেদ নামের এক লোক বিচ্ছেদ সইতে না পেরে গলায় ফাঁস নিয়ে মরতে গেছিল। তবে ফাঁসের দড়ি নরমাল থাকায় জাবেদ আলী এখনো বেঁচে আছে। এমনি অসংখ্য গাথা উপগাথা, কিংবদন্তি প্রচলিত আছে আমার শ্বাশুড়িকে ঘিরে।

আমার ধারনা “আইলাভিউ” বলা লোকটা শ্বাশুড়ির প্রাক্তন প্রেমিকদেরই কেউ। বেচারার ভালবাসার বুদবুদ এখনো আগের মতোই অটুট আছে। তা নাহলে চার সন্তানের জননীকে কিশোর প্রেমিকের মতো যন্ত্রণা করতো না। আমার শ্বশুরের অবশ্য স্ত্রীর প্রতি অন্য রকম দরদ। একবার নিউমার্কেটে এক বদ লোক আমার শ্বাশুড়িকে
ধাক্কা দিছিল। পরে শ্বশুরমশাই তাকে পিটিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। এখন যদি এই “আইলাভিউ” – এর খবর শ্বশুরের কানে যায় আরেকটা কুরুক্ষেত্র কায়েম হবে বাংলার জমিনে। নিতান্ত অসহায় না হলে শ্বাশুড়ি আমাকে ঘটনা জানাতো না। উদ্ধিগ্ন শ্বাশুড়ীকে ফোনে আশ্বস্ত করে বলেছি,
– চিন্তা করবেন না মা, আমি তড়িৎ ব্যবস্তা নিচ্ছি।
– তাড়াতাড়ি নাও তোমার শ্বশুর জানলে কী হবে একবার ভেবেছো?
– ওকে মা, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন আজকালের মধ্যেই ক্রিমিনালকে আপনার পায়ে সোপর্দ করবো।
– আমার পায়ে সোপর্দ করবা মানে! তুমি কী চাও সবাই এই ঘটনা জানুক?
– ঠিক আছে মা, নীরবে নিভৃতে অনুসন্ধান চালাবো।
– অনি তুমি যথেষ্ট ফাজিল, এই বিষয়টা নিয়ে অন্তত ফাজলামো করবানা আশা করি!
– মা, আমি হিনিয়াস ক্রাইম নিয়ে কখনো ফাজলামো করিনা। আই টেক ইট সিরিয়াসলি। আমি অলরেডি ক্রিমিনালের মোবাইল নাম্বর সিআইডিতে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিডিআর (কল ডাটা রেকর্ড) চলে আসবে।
– ঠিক আছে সন্ধ্যায় রিহানের আম্মুকে নিয়ে বাসায় চলে এসো।
– ওকে মা, ফোনটা নিরাপদে রাখবেন বাবার হাতে যেন না যায়!
শ্বাশুড়িকে সব বলে দিলেও কাজের কাজ কিছুই করি নাই। দরকারও নাই। এই মামলা সলভ করতে আমার ৫ মিনিট লাগবে।

সন্ধ্যায় স্বপরিবারে শ্বশুর বাড়ি পৌঁছালাম। গিয়ে দেখি ছোট শালিকা মৌ এসেছে। মৌ রাবিতে ম্যানেজমেন্টে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। মৌ আমার শ্বাশুড়ির মতোই দুর্দান্ত রূপসী। তবে প্রেম করে বলদা কিসিমের এক ছ্যাচড়ার সাথে! সুন্দরী মেয়েদের রুচি এতো নিম্নমানের কী করে হয় আমার বুঝে আসে না! রাতের খাবারের পর শ্বাশুড়ির ফোন দিয়েই আইলাভিউকে ফোন দিলাম, মাসুদ রানা নামের এক রিটায়ার্ড ফরেস্ট অফিসার ফোন ধরেছে। নিশ্চিত শ্বাশুড়ির কোন সাবেক প্রেমিক। যাই হোক মানুষকে ফোনে ডিস্টার্ব করার মজা এখন টের পাইবা মি. মাসুদ রানা। ফোন ধরতেই মাসুদ সাহেবকে কঠিন বকা দিলাম।
– হ্যালো, মাসুদ রানা সাহেব?
– জ্বী বলুন।
– বনে জঙ্গলে চাকরি করে বন্য প্রাণীর মতো আচরণ করেন কেন?
– কী বলছেন হাবিজাবি?
– হাবিজাবি মানে? একজন অশীতিপর বৃদ্ধাকে ফোনে ডিস্টার্ব করিস কেন রে বেটা?
কথা শেষ করার আগেই মাসুদ সাহেব ফোন কেটে দিছে!
এদিকে আমার শ্বাশুড়িকে অশীতিপর বৃদ্ধা বলায় তিনি খেপে গেছেন।
– অনি তুমি অশীতিপর বৃদ্ধা কাকে বললা?
– স্যরি মা!
– অশীতিপর বৃদ্ধা কাকে বলে জানো?
– না মা।
– বয়স ৮০ পেরোলে তাকে অশীতিপর বৃদ্ধা বলে। আমার বয়স ৫২। আমি বম্বের নায়ক সালমান খানের চেয়েও এক বছরের ছোট।
– স্যরি মা, ইনফরমেশনটা জানা ছিল না!
– তুমি ইচ্ছে করেই আমার সাথে এমন করো।
– বিশ্বাস করেন মা, আমি ইচ্ছে করে করেনি। আপনি যে সালমান খানের জন্মের এক বছর পরে জন্মেছেন আমার জানা ছিল না।

যাহোক মাসুদ রানা সাহেবের কথা শুনে তো মনে হয় না তিনি আইলাভিউ বলেছেন। নিশ্চয়ই অন্য কোন ঘাপলা আছে। আচ্ছা হঠাৎ করে মৌ বাসায় কেন ? রাজশাহী ভার্সিটির লিচু চুরিকে কেন্দ্র করে উতালপাতাল পরিস্থিতি তো এখন শান্ত। মৌকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। অন্য সময় বাসায় এলে খালামনির মোবাইল নিয়ে রিহান গেম খেলে। কিন্তু আজ রিহান খালি হাতে ঘুরাঘুরি করছে। মৌ-এর মোবাইল কোথায়? বিষয়টা সন্দেহজনক। পুত্র রিহানকে আদেশ দিলাম তাঁর খালামনিকে ডেকে আনার জন্য।
– মৌ তোমার মোবাইল কোথায়?
– চার্জে দিছি দুলাভাই।
– আচ্ছা মৌ রাবির লিচু চুরি প্রজেক্টে তোমার বলদা বয়ফ্রেন্ডটা কি ছিল?
মৌ কোন কথা বলছে না। নিরবতা সম্মতির লক্ষণ। নিশ্চিত প্রজেক্টে ছিল এবং ধরা খেয়ে নিদারুণ পেঁদানি খেয়েছে। আইলাভিউ বলার ঘটনাটি লিচু চুরির সাথে পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত বলে আমার ধারনা। মৌকে রিমান্ডে নিলেই মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে। এবং অবশেষে ঘটনা উদঘাটিত হলো। ঘটনা হচ্ছে মৌয়ের বয়ফ্রেন্ড লিচু চুরি করতে গিয়ে ভীষণ মার খেয়েছে। আর মৌ লিচু চোরের গার্লফ্রেন্ড অপবাদ নিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে এসেছে। রাগে দুঃখে অপমানে মৌ ফোন অফ করে রেখেছে। লিচু চোর কোন ভাবেই মৌকে না পেয়ে এই নাম্বরে কল দিয়েছে। আমার শ্বাশুড়ির কণ্ঠ আবার এফএম রেডিওর আরজেদের মতো মিষ্টি। সামান্য “হ্যালো” শুনেই বলদটা মনে করছে মৌ ফোন ধরেছে। এদিকে আমি যখন লোকেশান জানতে ফোন ব্যাক করলাম তখন আবার লিচু চোরের বাপে রিসিভ করছে! সে যাই হোক, লিচু চোরের বউকে বললাম,
– তাড়াতাড়ি ফোন করে বলদটাকে বলো, সে যেন আর হবু শ্বাশুড়িকে “স্যরি জান আইলাভিউ” না বলে।

১৪/০৬/২০২০, ১১.০৬ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *