সত্যজিৎ রায় (তৃতীয় পর্ব)

  •  
  •  
  •  
  •  

১৯৮০-র শুরুর দিকে ভারতীয় লোকসভা সদস্য ও প্রাক্তন অভিনেত্রী নার্গিস দত্ত তাঁর বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ আনেন যে তিনি “দারিদ্র্য রফতানি” করছেন, এবং সত্যজিতের কাছে “আধুনিক ভারত”-এর প্রতিনিধিত্ব করে এমন ছবি বানানোর দাবি করেন। অন্যদিকে ভারতজুড়ে সমাজতন্ত্রের প্রবক্তারা মনে করতেন সত্যজিৎ জাতির নিপীড়িত শ্রেণীর প্রতি “প্রত্যয়ী” ছিলেন না, বরং তিনি ‘‘পথের পাঁচালী’’ ও “অশনি সংকেত’’ ছবিতে বর্ণনাভঙ্গি ও নান্দনিকতার মাধ্যমে দারিদ্র্যকে মহৎ করে দেখিয়েছেন। তাঁরা আরও অভিযোগ করে যে সত্যজিৎ তাঁর ‘‘বুর্জোয়া’’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর ছবির সংঘাতগুলোর কোন সমাধান দেখাতে পারেন নি।

৭০-এর দশকের নকশাল আন্দোলনের সময় তাঁর ছেলে সন্দীপ এক পর্যায়ে শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। ৬০-এর দশকে সত্যজিৎ ও মার্ক্‌স্‌বাদী চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। বাণিজ্যিক অভিনেতা উত্তম কুমার-কে ছবিতে নেয়ার জন্য মৃণাল সত্যজিতের সমালোচনা করেন। সত্যজিৎ জবাব দেন যে মৃণাল কেবল “সহজ লক্ষ্য”গুলোতেই (তথা বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণী) আঘাত হানতে জানেন। কিংবদন্তির কথা ভারতে ও বিশ্বব্যাপী বাঙালি সম্প্রদায়ের কাছে সত্যজিৎ রায় একজন সাংস্কৃতিক প্রতিভূ। তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতার জীবনযাত্রা থেমে পড়ে। হাজার হাজার লোক শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর বাড়িতে আসেন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে সত্যজিৎ গভীর প্রভাব ফেলেন। সত্যজিতের চলচ্চিত্র কৌশল অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, গৌতম ঘোষ এবং বাংলাদেশের তারেক মাসুদ ও তানভীর মোকাম্মেল-কে অনুপ্রাণিত করেছে।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, মৃণাল সেন, ও আদুর গোপালকৃশনান-এর মত চলচ্চিত্র নির্মাতারা ভারতীয় চলচ্চিত্রে সত্যজিতের আসামান্য অবদান স্বীকার করেছেন। ভারতের বাইরে মার্টিন স্কোরসেজি, জেমস আইভরি, আব্বাস কিয়ারোস্তামি ও এলিয়া কাজান-এর মত চিত্রনির্মাতারা তাঁর কাজ দেখে প্রভাবিত হয়েছেন বলে ধারণা করে হয়। ইরা সাক্‌স-এর ২০০৫ সালে নির্মিত Forty Shades of Blue ছিল চারুলতা-র একটি দুর্বলভাবে অনুসৃত পুনর্নির্মাণ, আর ১৯৯৫ সালের মাই ফ্যামিলি ছবিটির শেষ দৃশ্য অপুর সংসার-এর শেষ দৃশ্যকে অনুসরণ করে তৈরি। ইদানিংকার কিছু ছবি, যেমন স্যাক্রেড এভিল, দীপা মেহতার এলিমেন্ট্‌স ত্রয়ী, এমনকি জঁ-ল্যুক গদার-এর চলচ্চিত্রেও সত্যজিতের চলচ্চিত্রের প্রতি নির্দেশ খুঁজে পাওয়া যায়। মার্কিন অ্যানিমেটেড টেলিভিশন সিরিজ দ্য সিম্পসন্‌স-এর আপু নাহাসাপিমাপেটিলন চরিত্রটির নাম রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্বাচন করা হয়। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সাথে সত্যজিতের ছবি ডোমিনিকা-র স্ট্যাম্পে স্থান পায় – কোন ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের জন্য এ জাতীয় ঘটনা এটাই প্রথম ।

[চলবে]

০৫/০৬/২০২০, ১০.০৮ PM

সত্যজিৎ রায় (প্রথম পর্ব)

সত্যজিৎ রায় (দ্বিতীয় পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *