সুহাসিনী

  •  
  •  
  •  
  •  

প্রিয়তমেষু,

পত্রের শুরুতেই শুভেচ্ছা নিও। ভাল আছো তো? না থাকলেও থেকো। ভাল থাকাটা দরকার। যদি তাও না পারো অন্তত অভিনয় করো ভাল থাকার। এটাই এমূহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। ঠিক যেভাবে ভাল থাকে আগুনের সঙ্গে অক্সিজেন। তুমি তো একা থাকতে পারো না প্রিয়তমেষূ। তার পরেও জীবন তোমাকে একাই চলতে শিখিয়েছে। চলতি পথে যখন সামনের পথ রুদ্ধ হয় ঠিক হরর মুভ্যির দৃশ্যপটের মতো, তখন চোখ বন্ধ করে একবার গভীরভাবে শ্বাস ছেড়ে পা ফেলো সামনের পানে। বিশ্বাস রেখো সৃষ্টি কর্তায়। একটু কষ্ট হবে বৈকি। কিন্তু সেটা বেশিক্ষণের নয়। তুমি পারবে, পারতে তোমাকে হবেই। ঠিক যেভাবে মানুষ তৈরি করেছে মহাকশের মধ্যে যন্ত্রযান। সেখানেও কিন্তু মানুষ থাকে, তা কি তুমি জানো না?

ফিরে তাঁকাও ফেলে আসা পেছনের দিকে। চোখ বন্ধ করো। মহাকালের ঘড়িকে পেছনে ঠেলো। সবই কী ব্যর্থতা, ব্যর্থতায় কি সবকিছু ঠাসা? নাহ! অনেক অর্জন আছে, শত মানুষের ভালবাসা, শত সহস্র্য শ্রমের নির্ঘুম রাত আছে এর পরতে পরতে। হয়তো তুমি কিছু মানুষের কাছে হিপোক্রেট হয়েছো, ভন্ড হয়েছো, প্রতারক হয়েছো। যাদের কাছে হয়েছো, তারা কেউই তোমার দূরের কেউ ছিল না। কাছের মানুষই ছিল। ভাল থাকার মিছিলে যোগ দিয়েছে তাঁরা সবাই। যেভাবে পিপীলিকা চলে। কিন্তু প্রিয়তমেষূ, তুমি তো জানো, তুমি কে, তুমি কী, তুমি কী কী করেছো, কার জন্য কতটুকু করেছো। সব, সব জানো। প্রাপ্তির খাতাটা না হয় শুন্যই থাকুক তোমার জন্য। একজীবনে সব পেতে হয় না প্রিয়তমেষূ। কিছু জিনিস না পাওয়াই থাক। থাকুক অধরা, থাকুক কিছু হাহাকার, বুকের সন্তর্পনে। ডোপামিন, সেরেটোনিনকে এখানেই থামিয়ে দাও। দরকার নেই এ হেরে যাওয়ার পুতুলখেলার। তুমি তো যোদ্ধা।

তাই তোমাকেই বলছি – “ঘুরে দাঁড়াও প্রিয়তমেষূ।” ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। এখনও বিস্তরপথ সামনে, যা তোমায় একা পাড়ি দিতে হবে। এখনও অস্বচ্ছ পাথরকুঁচিতে ফুলের জন্ম দেয়া সম্ভব। হাত বদলের মিছিলে যোগ দিও না আর সবার মতো। হাতবদলে সুখ নেই। সবই তো আকাশরঙা। মিথ্যের রঙিন সমুদ্রে অবগাহনে ব্যস্ত। সবাই না হয় হাতবদলে ব্যস্ত থাকুক, নিকুচিতে ব্যস্ত থাকুক। তুমি প্রতারকই থাকো, ক্ষতি নেই। বুকের গহীনে লাঙ্গল ফেলে, বীজ ফলিয়ে দেখানোর কিছু নেই। সবই মরিচিকা, সবই স্বার্থের পুজারি। স্বার্থ কেটে গেছে। তারাও কেটে গেছে। ঘোর মায়া উচ্ছেন্নে গেলে সবই কঙ্কালসার, সবই নগ্ন। জানো নিশ্চই।

হয়তো ক্ষণিকের দাবার চালে হেরে গেছো তুমি, কিন্তু এ খেলা অনেক বড়। ক্ষণিকের হেরে যাওয়া মানেই প্রস্তরখন্ডে আত্মহনন নয়। পজ বাটনে পুশ করো। প্রয়োজনে গ্যালিলিও হও। হলোগ্রামে স্থিরচিত্র হও। দৃশ্যপটের আড়ালে যাও কিছুসময়ের জন্য। দম নাও। দম ছাড়ো। জীবনের স্পন্দন অনুভব করো। এই বর্তমান সময়ের চলমান প্রবাহধারায় অন্তরাটুকু একদিন তুমিও টের পাবে। তুমিও স্থান পাবে কারো বুকের মাঝে, সঙ্গোপনে। তখন তোমার ভেতরে সুখের একটা সুবাস তৈরি হবে। টের পাবে তা তোমার বাম অলিন্দ। আর জানবে তোমার অন্তর্যামী।

জীবনটা ঘুড়ির সূতোর মতো সহজাভ নয়। পুরোটাই বর্তুলাকার। হয়তো পেঁচিয়ে গেছো। শক্তি বাড়াও। টান দাও সূতোয় আকাশ ছোঁয়ার। দেখবে আকাশ না পারো মেঘ তোমাকে চুমু দেবে তোমার কপোলে, অধরে। পাখিরা তোমায় অভিবাদন জানাবে। সারা জীবন কেউ পাশে থাকে না প্রিয়তমেষূ। সার্থপর দুনিয়ায়, মিথ্যার বেশাতিতে ভরা এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে আজীবন পাশে থাকে না কেউ। তুমি কি মধুশূন্য মৌঁচাকে কখনো মৌমাছিকে বসতে দেখেছো? দেখোনি। মধূ সঞ্চার করো নিজের ভেতরে। নিজেই মৌচাক হয়ে যাও। পাশ দেখানো মানুষগুলো ফিরে আসবে। তখন না হয়, স্মিত হেসো।

এখনও সময় প্রিয়তমেষূ, ঘুরে দাঁড়ানোর। নিজেকে নিজের কাছে ফেরানোর। কাহলান জিবরাল হয়ে উঠো। নিকোটিন, ভদকার স্বাদ ভুলে যাও। নোনতা স্বাদে অভুক্ত থাকো। তোমাকে উঠতেই হবে। দেখাতেই হবে ইকারাসের মতো। দুহাতে জীবনের মোম লাগাও। নিজেকে নিয়ে আরোহন করো সপ্তপাহাড়ের ওই শীর্ষদেশে। তুমি পারবে, আমি জানি তুমি পারবে প্রিয়তমেষূ। একজীবনে তিলোত্তমায় তোমাকে পারতেই হবে। সবাই তো পারে। ওরা যদি পারে বিজয়ের হোলিতে মেতে উঠতে, তুমিও পারবে। পারতে তোমাকে হবেই।

ভাল থেকো প্রিয়তমেষূ। অনেক অনেক ভাল। কেউ না থাকুক, আমি তো আছি। যেভাবে ছিল ইউক্লিড। তুমি কি জেনেছিলে, শহরের উষ্ণতম দিনে বৃষ্টি প্রার্থনার চেয়েও তীব্র ভাবে চেয়েছিলাম, তোমার নামের পাশের ধূসর বর্ণের বিন্দুটা সবুজ হয়ে যাক? সবুজ একদিন হবেই, তুমি দেখো। পাশেই আছি যেভাবে নিঃশ্বাস থাকে হৃদপিন্ডের সঙ্গে।
“তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।
ভাল থেকো প্রিয়তমেষূ।”

ইতি
তোমার সুহাসিনী

০৮/০৩/২০২০, ১১.৫৯ PM

বরাবর, সুহাসিনী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *