স্বপ্নবন্দনা

  •  
  •  
  •  
  •  

মহাখালী থেকে দূরপাল্লার বাসে উঠে বসে আছি। হঠাৎ এক যুবক ‘৩০ দিনে ইংরেজি শিখুন’ টাইপ কোন বই নিয়ে যাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। বাস ভর্তি যাত্রী মন লাগিয়ে যুবকের কথা শুনল। তারপর একজন যাত্রীকে দেখা গেল জানালা দিয়ে আমড়া ওয়ালাকে ডাকছে। ছেলেটি মানুষের এটেনশন পাবার জন্য ইংরেজিতে কথা বলছিল। ইংরেজি বই বিক্রি করার জন্য ইংরেজি জানা ছেলে চাই। এই হল প্রকাশকের মার্কেটিং পলিসি। আমি সাধারণত কোন মানুষের দিকে তাকালে মনে মনে মানুষটার একটা গল্প দাড় করিয়ে ফেলি। ছেলেটি রোজ কতটা বাসে দাড়িয়ে এভাবে নির্বিকার ইংরেজি বলে যায়। পরিচিত কোন মানুষকে দেখলে লজ্জা পায় কিনা। প্রতিটা বইতে সে কত টাকা কমিশন পায়। রোজ কতটা বই বিক্রি হলে তার তিন বেলা খাবারের টাকা উঠে আসে আমি জানি না। এই ছেলেটির সাথে আমার কথা হয়েছে। সে ন্যাশনাল ভার্সিটি থেকে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে। আমার চমকে উঠা আঁচ করতে পেরে সে জানাল তার মত এরকম অনেকেই আছে। একটা রেস্টুরেন্টের নাম বলে জানাল, তার দুজন ক্লাসমেট এখানে থালাবাসন ধুয়ে গ্রামে টাকা পাঠায়।

আমাদের দেশটা আমরা যাদের হাতে তুলে দিয়েছি আমি নিজে কোনদিন তাদের ক্ষমা করতে পারব না। আমাদের এই দেশটা ‘চাকরি নাই’ নামে এক মানসিক রোগে ভুগছে। একজনের কথা জানি, যে মাত্র তিন হাজার টাকার জন্য মিরসরাই ( ফেনীর কাছাকাছি) থেকে চিটাগাং শহরে এসে রোজ অফিস করে। যাওয়া আসার ভাড়া এবং দুপুরের খাবার মিটিয়ে মাস শেষে এই ছেলেটা হয়ত তার বাবার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট তুলে দেয়। ছেলেটা এক পর্যায় আসা যাবার খরচ মেটাতে অফিসের পাশে এক মসজিদে রাত কাটানো শুরু করল। এক মাস মসজিদে রাত কাটিয়ে বাবার হাতে হাজার দেড়েক টাকা তুলে দেবার যন্ত্রণা গুলো পাশ কাটিয়ে মধ্যম আয়ের দেশ বলে চিৎকার করলেই সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। একজনের কথা জানি যে অনেক মাস ধরে দুপুরে এবং রাতে ভাত খাওয়া ছেড়ে দিছে। লাঞ্চ টাইমে দুইটা বন খেয়ে দুই গ্লাস পানি খেলে নাকি আট ঘণ্টা পেট ভরা থাকে! বেতনের অর্ধেক মেসে দিতে হয়। বাকি অর্ধেক মা ‘ কে। মা পেরালাইসিস। বাবা মাছ ধরতে গিয়ে লঞ্চ ডুবে নিখোঁজ।

মায়ের ওষুধ খরচ বেড়ে যাওয়াতে মেস ছেড়ে রাতে ছাউনিতে থাকা শুরু। সকালে এমন ভাবে পরিপাটি হয়ে অফিসে আসে। দেখে বোঝার উপায় নেই! বহু রাত সে বালিশে ঘুমায় না। মেস ছাড়া যায়। মা’ কে তো আর ছাড়া যাবে না। এই ছেলে গুলাকে তুমি কী সাইকোথেরাপি দিবে? এ মাসে মেসের টাকা দিতে না পারলে যাকে রাস্তায় নামতে হবে। তাকে হেলাল হাফিজের কবিতার বই দিলে সে শান্ত হবে না। বাসা থেকে আর টাকা চাইবার মুখ নাই। বন্ধুরা সিগারেট ধরালে সেটা কখন দু টান দেয়া যাবে। অসুস্থ মা, এই ঈদে ভাগে হলেও গরু কিনতে হবে। মানুষের মাথায় কিলবিল করছে এরকম অসংখ্য যন্ত্রণা। এদের তুমি সিনেমা হলে অস্কারপাওয়া মুভি দেখিয়ে। কে কবে কেন নোবেল পাইছে এই সব জ্বালাময়ী বক্তিতা দিয়ে কিংবা ঘোরগ্রস্ত গান শুনিয়ে শান্ত করতে পারবে না। সত্যিকার অর্থে এই ব্যাপারটি এড়িয়ে যাবার আর কোন অপশন নেই। নতুন প্রজন্ম, বিপ্লব। ট্যালেন্ট হাটের বাজার পরেও দেয়া যাবে। আগে মানুষ বাঁচাই। পেরাসিটামলের ট্যাবলেট দিয়ে ক্যান্সারের রোগীকে সুস্থ করা যাবে না।

২৮/০২/২০২০, ১১.৪৮ PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *