হত্যা ও ভালোবাসা

  •  
  •  
  •  
  •  

সত্য ঘটনার পুলিশ ডায়েরী। খুব ভোরে পীরগাছার অন্নদানগর রেল লাইনের পসুকানপুকুর রেল ব্রীজের কাছে হাত-পা-মাথা বিচ্ছিন্ন কাটা ছেড়া একটি মৃত দেহের উপস্থিতি সবাইকে হতবাক করে। গ্রামের মানুষ রেল লাইনের উপর এরুপ দূর্ঘটনা দেখতে মোটেই অভ্যস্ত নয়। অনভ্যস্ত ঘটনা দেখার জন্য উৎসুক লোকের জমায়েত বাড়তে থাকে। কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারে না মৃতদেহটি কার বা কোথা থেকে এসেছিল। রেল ব্রীজ হতে ৮-১০ কিঃ মিঃ দূরে তাম্বলপুর বাজার। কাউনিয়া সান্তাহার রেল লাইনটি এ বাজারটি স্পর্শ করে গিয়েছে। ২০১৪ সালে T-20 বিশ্বকাপ ক্রিকেট সারা বাংলাদেশকে মাতিয়েছে। তাম্বুলপুর-ই বা বাদ থাকবে কেন? নিকটবর্তী সাধু সোনারায় গ্রামের আল আমিন নয়নের বাবা মোঃ রফিকুল ইসলাম স্থানীয় মুদি দোকানদার। ৬-ই এপ্রিল ছিল সম্ভবত বিশ্বকাপের শেষ দিন। বাড়িতে বিদুৎ সংযোগ না থাকায় নয়ন মা’কে বলে বাজারের ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে খেলা দেখতে যায়। মোটামুটি ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত সুদর্শন এ ছেলেটি গাইবান্ধা সরকারী কলেজের ইতিহাসের ৩য় বর্ষের ছাত্র।

কলেজের ছুটি পেয়েই এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে এসেছে। প্রতিদিন ক্রিকেট খেলা দেখে রাত ১০টার মধ্যে বাড়িতে ফেরে। সেদিনও ফেরার কথা। গ্রামে রাত নামে ঝুপ করে। ছেলেটি ফিরে না আসায় বাবা-মা’র উদ্বেগও বাড়ে ক্রমান্বয়ে। সময় গড়িয়ে যায়। পরদিন বেলা ১১টার সময় রেল দূর্ঘটনার কথা কানে আসায় উৎকন্ঠিত বাবা তড়িঘড়ি করে ছোটেন সুকান পুকুর রেল ব্রীজের দিকে। রেল লাইনের উপর দূর্ঘটনা। নিয়ম অনুযায়ী এসব দূর্ঘটনায় মৃতদেহের আইনী নিস্পত্তি বর্তায় রেল পুলিশের উপর। ততক্ষনে বোনারপাড়া রেল থানা থেকে পুলিশও এসে গেছে। মোঃ রফিকুল ইসলামের গগনভেদী আহাজারি’র মধ্যেই চলতে থাকে পুলিশের সুরতহাল (ইনকোয়েস্ট) প্রতিবেদন তৈরীর কাজ। বাংলাদেশে কেউ যদি দূর্ঘটনায় মারা যায় তাহলে আপনজনেরা মৃতের আর ময়নাতদন্ত (পোস্ট-মর্টেম) করাতে চায় না। তারা মনে করে ডাক্তারদের এ কাটা-ছেড়া মুর্দার আত্মার শুধু কষ্টই বাড়ায়। সকলের পরামর্শে ময়না তদন্ত না করে পুত্রশোকে উদভ্রান্ত এক পিতা কাঁধে নিয়ে চললেন তার একমাত্র উত্তরাধীকারীকে। মধ্যবয়সী এ দম্পতির শোক দেখার আর কেউ নেই। সপ্তাহ না যেতেই একদিন হাওয়ায় গুন্জন শোনা যায় ফকির পাড়ার একটি মেয়ের সাথে তার ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রায় ২ কিঃ মিঃ দূরের এ ফকির’রা ধনে-জনে-মানে বলীয়ান।

শোকাতুর পিতা রফিকুল এর মন মানে না-কেন তার বাধ্য ছেলেটি বাড়িতে না এসে উল্টো দিকের রেল লাইনে এত দূরে চলে গেল! এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই একদিন সোজা চলে গেলেন ৬০ কিঃ মিঃ দূরের বোনারপাড়া রেল থানায়। কিন্তু ছেলের হাতের মোয়ার মত চাইলেই তো থানায় মামলা করা যায় না- যেখানে সবাই জানে ঘটনাটি দূর্ঘটনা। একই কারণে গ্রামের কাউকে সাথেও পেলেন না এ দূর্ভাগা পিতা। তিনি আদালতের স্মরণাপন্ন হলেন। আদালতের নির্দেশে খুনের মামলা হলো, কিন্তু মৃত দেহের তো ময়না তদন্ত হয় নাই। সুতরাং ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশ উত্তোলন করে রংপুর মেডিকেল কলেজে পাঠাতে হলো। তারাও মতামত দিলেন- হ্যা ছেলেটি রেল দূর্ঘটনায় মারা গেছে। আর তো সংশয় নাই-তাই পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়- FRMF (Final Report Mistake of Fact) হিসেবে – নয়নকে কেউ খুন করে নাই। সোজা বাংলায় – “ঘটনার ভুল বুঝাবুঝি”। কিন্তু পিতা মোঃ রফিকুল ইসলাম মানলেন না, না-রাজী দিলেন আদালতে। পাক্কা আড়াই বছর আগের ঘটনা। পিবিআই রংপুর ইউনিট ইনচার্জ মোঃ শহিদুল্লাহ কাওছার এর নেতৃত্বে টিম বসেছে মামলার ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষনে। মৃতদেহের একটা ছবি ব্যতীত কোন কিছুই কাজে লাগে না কারণ সবাই দূর্ঘটনার পক্ষে। ছবিটি বড় (ZOOM) করে বিশ্লেষণ করতেই দেখা গেল বুকের বাম পার্শ্বে একটা চিকন গভীর ক্ষত (Deep Incised Wound)।

পিএম ও ইনকোয়েস্ট রিপোর্টে এ ক্ষত সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ নেই। রেল এক্সিডেন্টে তো এরকম ক্ষত থাকার কথা না। তদন্তকারী কর্মকর্তা খোঁজার চেষ্ঠা করেন সেই সময়ে কারা কারা ক্রিকেট খেলা দেখেছিল, কে কে নয়নের পাশে বসেছিল এবং সর্বশেষ তাকে কোথায় দেখা গিয়েছিল। দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি হাতরিয়ে তারা যতটুকু তথ্য দেয় তার ভিত্তিতে নয়নের বন্ধু আশিকুর রহমান তুষারকে নিয়ে আসা হয়। তুষারের কথামত নিয়ে আসা হয় জুয়েল মিয়াকে; সে ঐ মেয়েটির বৈমাত্রেয় ভাই। জুয়েল মিয়া আদালতে স্বীকার করে- বিশ্বকাপের সেদিন ছিল চাঁদনী রাত। খেলা শেষে তুষার, আল আমিন নয়নকে বলে সেই মেয়েটি তৎক্ষনাৎ তাকে দেখা করতে বলেছে। বন্ধুর কথায় সরল বিশ্বাসে নয়ন, তুষারের সাথেই মেয়েটির বাড়িতে যায়। উঠানে গিয়েই দেখে সেখানে তার অপেক্ষায় আছে মেয়েটির ভাই মুকুল মিয়াসহ, চাচাত ও বৈমাত্রেয় ভাই জুয়েল, মনির এবং রাঙ্গা। মুকুল নয়নসহ সকলকে মাঠে হাওয়া খাওয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়। কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা হাওয়া খাওয়ার জন্য নয়নকে নিয়ে রওনা হয়।

সারা পথ মুকুল নয়নের হাত ধরে গল্প করে। তারা খোশ গল্প করে আর সামনে চলে। ফকিরপাড়ার পরই ধানক্ষেত। ধানক্ষেতের মধ্যে একটি কালভার্ট। কালভার্ট-ই ছিল নয়নের শেষ গন্তব্য। হঠাৎ মুকুল তার লুঙ্গীর মধ্য হতে একটি ছুরি বের করে নয়নের বুকের বাম পাশে হৃৎপিন্ড বরাবর বসিয়ে দেয়। নয়ন মাটিতে পড়ে যায়। একজন মুখ চেপে ধরে অন্যরা পা ও হাত। চলতে থাকে এলোপাথারি ছুরির আঘাত। কালভার্টের পাশেই লুকানো ছিল একটি বস্তা, কোদাল ও ভ্যানগাড়ি এবং দড়ি। খুনিরা মৃত্যু নিশ্চিত করার পর নয়নকে বস্তায় ঢুকিয়ে ভ্যান গাড়িতে উঠায়। কোদাল দিয়ে মাটির রক্ত পরিস্কার করে কালভার্টের নিচে ফেলে দেয়- যেন ভাগের মা গঙ্গাঁ সব পাপ মুছে নেবে। কিছু কচি ধান গাছ দিয়ে জায়গাটি ঢেকে দিয়ে খুনিরা নিজেরাই ভ্যান চালিয়ে চলে যায় ১০ কিঃ মিঃ দূরের সুকান পুকুর রেল ব্রীজের কাছে। অপেক্ষায় থাকে কখন ট্রেন আসবে। রাত তখন প্রায় পৌনে ১টা। নির্ধারিত সময়ে সান্তাহার হতে লালমনিরহাটগামী ট্রেনের শব্দ শুনেই বস্তা খুলে খুনিরা নয়নের নিথর শরীরটাকে শুইয়ে দেয় রেল লাইনের উপর। এ খুনিরাই পরদিন সকালে রেল ব্রীজে দূর্ঘটনার পক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল। এ মৃত্যুর কয়েকদিন পর মেয়েটিকে সিলেটে নিয়ে এক প্রবাসীর সাথে বিয়ে দিয়ে ইউরোপে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ইতিহাসের ছাত্র আল আমিন নয়ন কোন ইতিহাস সৃষ্টির জন্য নয়, শুধুমাত্র হৃদয় দিয়ে ভালবেসেছিল মেয়েটিকে। হতভাগ্য সেই বিদীর্ণ হৃৎপিন্ড-ই খুনিদের ঠিকানায় পৌঁছাতে অন্ধকারে আলোর নিশানা ঠিক করে দেয়।

২২/০৯/২০২০, ১০.৫৫ PM

সুত্রঃ বোনারপাড়া রেলওয়ে থানার মামলা নং-০২, তারিখঃ ১৪/০৪/২০১৪ খ্রিঃ
ধারা-৩০২/২০১/৩৪ দঃ বিঃ।

[পুলিশ বুর‍্যো অব ইনভেস্টিগেশন এর সাফল্য।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *